সম্পত্তির লোভে ফাঁদে ফেলে বাবাকে গলায় গামচা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে ছেলে ও তার এক সহযোগী। এরপর লাশ ফেলে দিয়েছিল হালিশহর আউটার রিং রোডের জঙ্গলে। সন্তানের হাতে নির্মম ভাবে খুন হওয়া সেই হতভাগা পিতার লাশ দাফন হয়েছিল বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে। ঘটনাটি দুই বছর আগের। নিহতের পরিচয় উদঘাটন ও হত্যার কারণ নির্ণয় করতে না পেরে থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দিয়েছিল। এমন লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পর ঘাতক ছেলে ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো।
পরিকল্পিতভাবে এক নারীকে ব্যবহার করে ফাঁদ পেতে ছেলে তার সহযোগীকে নিয়ে নিজের বাবাকে হত্যা করে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী এই সংস্থার সংশ্লিষ্টরা। হত্যাকাণ্ডে জড়িত এক নারী সহযোগীকেও শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন নিহত মীর মজিবুর রহমান খানের ছেলে বেলাল হোসেন (৩৫) ও বেলালের সহযোগী আব্দুল জলিল। এর আগে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর বাঁশখালীর চাম্বল এলাকা থেকে বেলালের ভাই মো. আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছিল পিবিআই।
চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের তথ্য জানাতে গতকাল সোমবার দুপুরে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সংস্থার মহানগর ইউনিটের পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম।
খুন হওয়া মীর মজিবুর রহমান খান (৬০) চট্টগ্রামের বাঁশখালী জেলার পূর্ব চাম্বল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তার প্রথম স্ত্রীর ঘরে আছে দুই ছেলে বেলাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে সালমা খানম নামের একটি মেয়ে আছে। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর মজিবুর রহমান তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নানা বাড়ি ফটিকছড়িতে থাকতেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২২ সালে মজিবুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেলে তিনি বাঁশখালীতে থাকা নিজের কিছু জমি বিক্রি করে দ্বিতীয় ঘরের মেয়ে সালমাকে সেই টাকা দেন। এতে প্রথম ঘরের সন্তান বেলাল ক্ষিপ্ত হয়। এতে বেলালের ধারণা হয়, বাবা তাকে পৈতিৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করছে। পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, মজিবুর রহমান নিজের আরো সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নিলে বেলাল হোসেন বাবাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। খুনের ঘটনার আগে থেকেই বেলাল চট্টগ্রাম নগরীতে সিএনজি টেঙি চালাতেন, থাকতেন খুলশী থানা এলাকায় এক ভাড়া বাসায়। বাঁশখালীতে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন তার ভাই আনোয়ার হোসেন।
পিবিআই–এর পুলিশ সুপার বলেন, বেলাল হোসেন পরিকল্পনা অনুযায়ী তার পূর্ব পরিচিত এক নারীকে তার বাবার সাথে টেলিফোনে প্রেমের অভিনয় করার পরামর্শ দেয়। বেলাল হোসেনের পরামর্শে ওই নারী মজিবুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে।
এর মধ্যে মজিবুর রহমান ২০২৪ সালের ৬ জুন ফটিকছড়ির বাড়ি থেকে নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় তার মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে আসেন। মেয়ের বাসায় থাকাকালে ৭ জুন মজিবুর রহমান মোবাইলে যোগাযোগ হওয়া নারীর অনুরোধে নগরীর বাকলিয়া থানার আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরি এলাকায় তার বাসায় যান। ওই বাসায় আগে থেকেই বেলাল হোসেনের স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী আব্দুল জলিল উপস্থিত ছিলেন বলে পিবিআইয়ের ভাষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মজিবুর রহমান ওই বাসায় গেলে সেই নারী ও আব্দুল জলিল শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে মজিবুরকে খাওয়ান। এতে তিনি অর্ধচেতন হয়ে পড়েন। পরে সেদিন বিকালে আব্দুল জলিল ও বেলাল হোসেন মিলে একটি সিএনজি টেঙি করে মজিবুরকে নগরীর সিআরবি এলাকায় নিয়ে যান।
পিবিআই–এর পুলিশ সুপার বলেন, সিআরবিতে মজিবুরকে টেঙিতে জলিলের পাহারায় রেখে বেলাল নগরীর লালদীঘি পাড় থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়ায় নিয়ে আসেন। তারপর মাইক্রোবাসটি নিজে চালিয়ে সন্ধ্যার দিকে আব্দুল জলিলসহ মজিবুরকে হালিশহর থানার আউটার রিং রোডে নিয়ে যায়। সেখানে গাড়ি থামিয়ে বেলাল হোসেন ও আব্দুল জলিল মজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং লাশটি রাস্তার পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।
হত্যার সময় মজিবুরের পরনে ছিল সাদা লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি। গলায় গামছাটি পেঁচানো অবস্থায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছিল।
বাবার কোনো খোঁজ না পেয়ে মজিবুর রহমানের মেয়ে সালমা খানম ওই বছরের ৭ জুলাই কোতোয়ালী থানায় একটি জিডি করেন। পরে ওই বছরের ৬ নভেম্বর আদালতে অপহরণের মামলা করেন। এর মধ্যে ৯ জুন নগরীর হালিশহর থানার আউটার রিং রোড এলাকার জঙ্গল থেকে লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
হালিশহর থানা পুলিশ লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি দাফন করেছিল। নিহতের পরিচয় উদঘাটন ও হত্যার কারণ নির্ণয় করতে না পেরে থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দিয়ে দেয়।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আরেক ছেলে আনোয়ারের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পিবিআই পুলিশ সুপার বলেন, এখন পর্যন্ত তদন্তে আনোয়ারের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং তদন্তে বেলাল ও তার ভাইরা জলিলের নামই মূল অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেমিকার মাধ্যমে ভিকটিমকে একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে দেওয়া হয়। আসামিদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে দুই বছর আগে উদ্ধার হওয়া একটি অজ্ঞাতনামা লাশের আলামতের মিল পাওয়া গেছে। প্রেমিকার পরিচয় শনাক্ত করা হলেও তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে গত শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যারটেক এলাকা থেকে নিহতের ছেলে বেলাল হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার ঘোড়ামারা এলাকা থেকে তার সহযোগী আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বেলাল হোসেনকে গত রোববার আদালতে উপস্থাপন করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান পিবিআই কর্মকতারা। এ ঘটনায় বেলালের সহযোগী ওই নারীকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।












