কক্সবাজারের কৃষি : চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়

ড. মো. জামাল উদ্দিন | সোমবার , ১৫ জুন, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজার দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষি অঞ্চল হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, ভূমি অবক্ষয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তি সমপ্রসারণের সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষি খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না। অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তি, উচ্চমূল্যের ফসল, ফল ও মসলা চাষ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপর্যটনের অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান। এসব বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে। কক্সবাজার জেলা বর্তমানে সাতটি উপজেলা সমন্বয়ে গঠিত। চকরিয়া, উখিয়া, টেকনাফ, মহেষখালী, কুতুবদিয়া, রামু ও কক্সবাজার সদর এসব উপজেলার কৃষি বেশ বৈচিত্র্যময়। উপজেলাভিত্তিক কৃষির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বেশ গুরুত্ব বহন করে।

চকরিয়া কক্সবাজারের কৃষি অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে চকরিয়া বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ কৃষি, ব্যবসা ও যোগাযোগের দিক থেকে চকরিয়া কক্সবাজার জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। চকরিয়ার বিস্তীর্ণ সমভূমিতে ধান, ভুট্টা, শাকসবজি, পান, ফল ও মৎস্য উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাতামুহুরী নদীর ভাঙন, বন্যা, খাল ভরাট, অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ এবং কৃষিজমি অকৃষি খাতে রূপান্তরের ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। চকরিয়ায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, উচ্চফলনশীল ও জলবায়ুসহনশীল জাত সমপ্রসারণ এবং কৃষক সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে এটি দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের একটি শক্তিশালী কৃষি হাবে পরিণত হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চকরিয়ার জনসভা কৃষকের প্রত্যাশা ও সমস্যাগুলো সরাসরি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উখিয়া রোহিঙ্গা সংকটের চাপের মধ্যেও কৃষির সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল যদিও বর্তমানে এ উপজেলা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও বনভূমি হারিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে। কৃষকরা সেচ, শ্রম ও বাজারজাতকরণে অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে উখিয়ার পাহাড়ি ঢাল ও উঁচু জমি ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম, আম, মাল্টা, আনারস, পান, আদা ও হলুদ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নাফনদী সংলগ্ন মৎস্য চাষ এলাকার মানুষের জীবিকার ও রপ্তানির অন্যতম খাত। এখানে জলবায়ুসহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, সৌরচালিত সেচ এবং পাহাড়ি ফলবাগান সমপ্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। রোহিঙ্গা সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য একটি বিশেষ কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ সময়ের দাবি।

টেকনাফ সীমান্ত অঞ্চলের কৃষি ও লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ থাকলেও অমিত সম্ভাবনা লুকায়িত রয়েছে। এটি দেশের দক্ষিণতম উপজেলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি অঞ্চলগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। অনেক কৃষক ধান চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। টেকনাফের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের জন্য বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তরমুজ, চিনাবাদাম, মরিচ, তিল, সূর্যমুখী, ড্রাগন ফল, নারিকেল সুপারি এবং বিভিন্ন মসলা ফসলের বাণিজ্যিক চাষ সমপ্রসারণ করা সম্ভব। মৎস্য চাষ ও লবণ উৎপাদন এ উপজেলার অন্যতম আয়ের উৎস। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। টেকনাফে লবণসহিষ্ণু ধান ও সবজি প্রযুক্তি সমপ্রসারণ, খাল পুনঃখনন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণের জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।

মহেশখালী লবণ, পান ও ফলভিত্তিক কৃষির সম্ভাবনা বেশ জোরালো। মহেশখালী বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে। তবে কৃষি খাতকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এখানকার পান চাষ, লবণ উৎপাদন, তরমুজ, সবজি ও ফলচাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পায়নের ফলে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। তাই অবশিষ্ট কৃষিজমিতে উচ্চমূল্যের ফসল এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সমপ্রসারণ জরুরি। কৃষকদের জন্য বিকল্প জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিও প্রয়োজন।

কুতুবদিয়া জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপ কৃষি হিসাবে বিবেচিত। এ উপজেলা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ধান ও সবজি উৎপাদন সীমিত হচ্ছে। তবুও নারিকেল, তরমুজ, মরিচ, সূর্যমুখী এবং লবণসহিষ্ণু ফসল চাষের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। কুতুবদিয়ায় টেকসই বেড়িবাঁধ, মিঠাপানি সংরক্ষণ এবং জলবায়ুসহনশীল কৃষি প্রযুক্তির সমপ্রসারণ ছাড়া কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

রামু কৃষি বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তি সমপ্রসারণের সুযোগ বিদ্যমান। এ উপজেলায় ধান, সবজি, কলা, পেঁপে, আম, লেবু এবং মসলা ফসল উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে কৃষকরা এখনও আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগ থেকে পুরোপুরি সুবিধা পাচ্ছেন না। এখানে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত উন্নত জাত ও প্রযুক্তি দ্রুত সমপ্রসারণ করা গেলে উৎপাদন ও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

কক্সবাজার সদর নগরায়নের চাপে থাকলেও কৃষির রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। সদর উপজেলায় দ্রুত নগরায়নের ফলে কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে। তবুও উচ্চমূল্যের সবজি, ফুল, ফল এবং নগর কৃষির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটন শিল্পের সাথে কৃষিকে সংযুক্ত করে কৃষিপণ্য বিপণনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ভ্যালুএডেড পণ্য সহজে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এগ্রোট্যুরিজমের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজারে টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও রুপান্তরে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে. উখিয়া, টেকনাফ ও চকরিয়ার জন্য বিশেষ কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ, . লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন, . উখিয়াটেকনাফের নাফনদী সংলগ্ন চিংড়ি চাষ উন্নয়ন ও রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধিতে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ, . কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন, . পাহাড়ি ও উপকূলীয় কৃষির জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, . কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, যান্ত্রিকীকরণ ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা, . জলবায়ু সহনশীল কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যক্রম জোরদার করা এবং সে লক্ষ্যে কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবী; এবং ৮. রোহিঙ্গা সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়ার কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা কৃষক কার্ড প্যাকেজ অন্তর্ভুক্ত করা।

কক্সবাজার শুধু পর্যটনের রাজধানী নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও উপকূলীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যথাযথ পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা পেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কক্সবাজারের কৃষি উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এটাই জেলার আপামর কৃষক সমাজের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), সাবেক ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, এফএও, জাতিসংঘ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকবিয়াল রমেশ শীল স্মরণে
পরবর্তী নিবন্ধত্বরিকতের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা আল্লামা ফরহাদাবাদী (রহঃ)