বাঁশ-কাপড়ের দোলায় ১০ কিমি পাহাড়ি পথ পেরিয়ে হাসপাতালে প্রসূতি

রাঙামাটির ভরতপাড়া হাসপাতালে নেওয়ার মতো সড়ক নেই

রাঙামাটি প্রতিনিধি | রবিবার , ১৪ জুন, ২০২৬ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ভরতপাড়ায় গত শুক্রবার রাতে প্রসববেদনায় কাতর হয়ে পড়েন জেসিকা চাকমা (১৯)। গ্রামের ধাত্রী দিয়ে প্রসবের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো সড়ক নেই, নেই অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সুযোগ। শেষ পর্যন্ত শনিবার সকালে গ্রামের মানুষ বাঁশ ও কাপড় দিয়ে তৈরি অস্থায়ী দোলায় ঝুলিয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি দৃশ্য আবারও সামনে এনেছে পার্বত্য অঞ্চলের বহু মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট।

সুমন জ্যোতি চাকমা নামের স্থানীয় এক গ্রামপুলিশ সদস্য ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করেন। ভিডিওর সূত্র ধরে জানা যায়, রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার আইমাছড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভরতপাড়া এলাকার ঘটনা এটি। ভরতপাড়া গ্রাম থেকে প্রায় ৮১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ওই প্রসূতি নারীকে পার্শ্ববর্তী জুরাছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন গ্রামের মানুষ। দুর্গম এই পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে হাসপাতালে পৌঁছাতে তাদের সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। জুরাছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর ওই নারীর নরমাল ডেলিভারি (স্বাভাবিক প্রসব) হয়। বর্তমানে ওই নারী ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেনবলছেন চিকিৎসক।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, প্রায় ১০১২ জন গ্রামবাসী বাঁশের সঙ্গে বাঁশ বেঁধে প্রসূতিকে কাপড়ে ঝুলিয়ে রওনা দেন। ভিডিওতে কথা বলতে শোনা যায় স্থানীয় গ্রাম পুলিশ ও গ্রামের বাসিন্দা সুমন জ্যোতি চাকমাকে। ভিডিওতে সুমন জ্যোতি বলেন, আমরা অত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলে বাস করি। আজ একজন ডেলিভারি রোগীকে নিয়ে বিপাকে পড়েছি। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, এখানে রাস্তাই নেই। বাঁশের দোলায় করেই রোগীকে নিতে হচ্ছে।

জানা গেছে, সন্তান প্রসব করা নারী জেসিকা চাকমা (১৯) আইমাছড়া ইউনিয়নের ভরতপাড়ার বাসিন্দা বিজয় চাকমার স্ত্রী। বিজয় চাকমা বলেন, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে আমার স্ত্রীর প্রসব ব্যথা শুরু হয়। এরপর স্থানীয়ভাবে প্রসবের চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার সকাল ৭টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হই। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই স্বাভাবিক প্রসব হয়।

বরকল উপজেলার আইমাছড়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য শুভমালা চাকমা বলেন, ভরতপাড়াসহ আশপাশের এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার অবস্থা বেহাল। যে কারণে রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বর্ষা মৌসুমে অবস্থার আরও অবনতি হয়। জরুরি রোগী, প্রসূতি মা এমনকি মৃতদেহও অনেক সময় বাঁশের দোলায় বহন করতে হয়। এছাড়া কৃষিপণ্য আনানেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দুর্ভোগ।

জুরাছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অনন্যা চাকমা বলেন, সকালে বরকলের আইমাছড়া ইউনিয়নের ভরতপাড়া থেকে এক প্রসূতিকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই তার স্বাভাবিক প্রসব হয়। মা ও নবজাতক মেয়ে শিশু দুইজনই সুস্থ আছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআদ-দ্বীন কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরছে আমার পিছনে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধআমরা বাজেটকে যথাসম্ভব অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা করেছি : অর্থমন্ত্রী