ফ্যাটি লিভার : নীরব ঘাতক প্রতিরোধে এখনই সময়

অধ্যাপক ডাঃ এস. এম. আলী হায়দার | বৃহস্পতিবার , ১১ জুন, ২০২৬ at ৬:২২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের (Non-Communicable Diseases) ক্রমবর্ধমান বোঝা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করছি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে আরেকটি রোগ নীরবে বিস্তার লাভ করছে, যা একদিকে লিভার ধ্বংস করছে, অন্যদিকে হৃদরোগ, কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। রোগটির নাম ফ্যাটি লিভার।

১১ জুন বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য Act Now ‘এখনই পদক্ষেপ নিন’। এই আহ্বান কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবসের আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়; বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য সতর্কতা।

ফ্যাটি লিভার এমন একটি অবস্থা যেখানে লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়। সাধারণত লিভারে সামান্য পরিমাণ চর্বি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এই চর্বির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে শুরু করে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় সম্পূর্ণ নীরব। কোনো ব্যথা নেই, জ্বর নেই, দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ নেই। ফলে অধিকাংশ মানুষ জানতেই পারেন না যে তাদের লিভার ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিকিৎসকের চেম্বারে প্রায়ই এমন রোগী আসেন, যিনি অন্য কোনো কারণে আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে গিয়ে প্রথম জানতে পারেন যে তার ফ্যাটি লিভার রয়েছে। অনেকেই বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আমার তো কোনো সমস্যা নেই, তাহলে লিভারের রোগ হলো কীভাবে?’

এই প্রশ্নের উত্তরই বর্তমান জনস্বাস্থ্য সংকটের মূল বিষয়। আজকের জীবনযাত্রা আমাদের শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছে। শহরকেন্দ্রিক জীবন, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, ফাস্টফুড নির্ভর খাদ্যাভ্যাস, কোমল পানীয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং নিয়মিত ব্যায়াম না করার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একটি ‘মেটাবলিক বিপর্যয়’ তৈরি করছে। এরই বহিঃপ্রকাশ ফ্যাটি লিভার।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় একতৃতীয়াংশ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। অর্থাৎ প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজন এই রোগ বহন করছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই হার বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপও দ্রুত বাড়ছে।

একসময় ধারণা করা হতো, অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণেই মূলত লিভারে চর্বি জমে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ ফ্যাটি লিভার রোগী কোনো ধরনের অ্যালকোহল গ্রহণ করেন না। এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা রোগটির নাম পরিবর্তন করে Metabolic Dysfunction-Associated Steatotic Liver Disease (MASLD) রেখেছেন। এই নামটি রোগটির প্রকৃত কারণ মেটাবলিক বা বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ফ্যাটি লিভারকে শুধু লিভারের রোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সামপ্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, ফ্যাটি লিভার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হৃদরোগই মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে রোগী লিভারের জটিলতায় নয়, বরং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। একইভাবে কিডনি রোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং টাইপ২ ডায়াবেটিসের সঙ্গেও ফ্যাটি লিভারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

আমার চিকিৎসা অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় অনেক রোগী মনে করেন ফ্যাটি লিভার একটি ‘সাধারণ’ সমস্যা। তারা এটিকে গুরুত্ব দেন না, কারণ আশপাশের অনেকেরই এই রোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের ‘সাধারণ’ ফ্যাটি লিভারই আগামী দশ বছরে সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার কিংবা লিভার ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজনীয়তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আরও উদ্বেগজনক হলো শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রোগটির ক্রমবর্ধমান বিস্তার। বর্তমানে স্কুলগামী শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগছে। মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম এবং অনলাইন নির্ভর জীবনযাপন তাদের শারীরিক কার্যক্রমকে সীমিত করে ফেলেছে। অন্যদিকে চিনিসমৃদ্ধ পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের অল্প বয়সেই বিপাকীয় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম আরও বড় স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হবে।

প্রশ্ন হলো আমরা কী করতে পারি?

প্রথমত, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এখনও অনেক মানুষ জানেন না যে ফ্যাটি লিভার একটি গুরুতর রোগ এবং এটি প্রতিরোধযোগ্য। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং বাড়াতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তে অতিরিক্ত চর্বি রয়েছে, তাদের নিয়মিত লিভার মূল্যায়নের আওতায় আনা জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে জটিলতা প্রতিরোধ করা অনেক সহজ হয়। তৃতীয়ত, জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নগর পরিকল্পনায় হাঁটার পথ, উন্মুক্ত মাঠ এবং ব্যায়ামের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও শারীরিক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। চতুর্থত, খাদ্যনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। অতিরিক্ত চিনিসমৃদ্ধ পানীয় এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণের সময় এসেছে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে সুগারসুইটেনড বেভারেজের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া উচিত।

সুখবর হলো, ফ্যাটি লিভারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের ওজন মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেও লিভারের চর্বি ও প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রগতি থামিয়ে দিতে সক্ষম।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রমকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, ফাস্টফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করতে হবে।

বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। কারণ ফ্যাটি লিভার নীরবে এগোয়, কিন্তু এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত গুরুতর।

আজ যখন বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ শুধু একটি রোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

তাই বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক সচেতনতা থেকে প্রতিরোধ, প্রতিরোধ থেকে সুস্থতা। এবারের প্রতিপাদ্য Act Now আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ফ্যাটি লিভার একটি নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি, যার মোকাবিলায় দেরি করার সুযোগ নেই। সময়মতো জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা এই রোগের জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারি।

আসুন, ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে সঠিক সিদ্ধান্ত, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো চিকিৎসার জন্য আগামীকাল নয়, এখনই পদক্ষেপ নিন।

লেখক: মেডিসিন, লিভার ও পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, পরিপাকতন্ত্র ও লিভার ব্যাধি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিপুল করুণার উপকূলে প্রফেসর ডা. মাহমুদুল হক চৌধুরী
পরবর্তী নিবন্ধমমতার তৃণমূল কি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাবে?