বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল বৈজ্ঞানিক আলোচনা বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বিষয় নয়; এটি এখন বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের অংশ। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অফিসিয়াল থিম Inspired by Nature. For Climate. For Our Future. অর্থাৎ ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ মূলত এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবস জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রকৃতি থেকে সমাধানের উৎস খুঁজে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। এই আহ্বানের মর্মকথা হলো প্রকৃতি, জলবায়ু ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এখনই উদ্যোগী হওয়া। আহ্বানটি নিঃসন্দেহে মহৎ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, এই ‘এখনই কাজ শুরু করুন’ বার্তার আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও নৈতিক ভার কার কাঁধে পড়বে?
বাংলাদেশ কি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান দায়ী দেশ? উত্তর স্পষ্ট ’না’। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারণ অতিরিক্ত কার্বন ডাই–অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলো কয়লা, তেল, গ্যাস ও শিল্পায়নের মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ছড়িয়েছে। তাদের উন্নয়ন, তাদের ভোগবাদী অর্থনীতি, তাদের দীর্ঘদিনের উচ্চ জ্বালানি ব্যবহার আজ পৃথিবীকে উষ্ণ করেছে। অথচ বাংলাদেশ, যার মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ বিশ্বের উচ্চ–নিঃসরণকারী দেশগুলোর তুলনায় নগণ্য, সেই বাংলাদেশকেই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে এক টনেরও কম ঈঙ₂ নিঃসরণ করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, চীনসহ উচ্চ শিল্পায়িত ও বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর মাথাপিছু নিঃসরণ বাংলাদেশের তুলনায় বহু গুণ বেশি। ভারতও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ করে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, খরা, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও জলাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি বহন করছে বাংলাদেশের মতো স্বল্প–নিঃসরণকারী ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো।
এটাই জলবায়ু জাস্টিসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যারা সবচেয়ে কম অপরাধ করেছে, তারা সবচেয়ে বেশি শাস্তি পাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষ লবণাক্ত পানির সঙ্গে লড়ছে, কৃষক অনিশ্চিত বৃষ্টি ও খরার সঙ্গে লড়ছে, শহরের মানুষ জলাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার সঙ্গে লড়ছে, নদীতীরের মানুষ ভাঙনের সঙ্গে লড়ছে, আর দরিদ্র পরিবারগুলো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কাছে কোনো তাত্ত্বিক সংকট নয়; এটি ঘরবাড়ি হারানোর ভয়, ফসল নষ্ট হওয়ার কষ্ট, পানীয় জলের সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব নাম।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল ও এলডিসি–উত্তরণরত দেশ। দেশের সামনে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসের মতো অসংখ্য জরুরি অগ্রাধিকার রয়েছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাঁধ উঁচু করা, উপকূল রক্ষা করা, নদী ব্যবস্থাপনা করা, জলাবদ্ধতা কমানো, লবণাক্ততা মোকাবিলা করা, জলবায়ু–সহনশীল কৃষি গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমপ্রসারণ করা, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও সাইক্লোন সেল্টার ব্যবস্থা উন্নত করা এসব কাজের জন্য বিপুল অর্থ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে সবকিছু করা সম্ভব নয়।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু দুর্যোগ শুধু একটি দিনের বিপর্যয় নয়; এর ক্ষত বহু বছর ধরে মানুষের জীবন, কৃষি, পানীয় জল, বসতি ও জীবিকাকে বিপন্ন করে রাখে। উপকূলের বহু এলাকায় লবণাক্ততা এখন শুধু কৃষির সমস্যা নয়, এটি স্বাস্থ্য, নারীজীবন, শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয় অর্থনীতির সংকটেও পরিণত হয়েছে।
তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বাংলাদেশের বার্তা হওয়া উচিত– আমরা দায়িত্ব এড়াতে চাই না, কিন্তু দায়ের ভার ন্যায্যভাবে ভাগ হতে হবে। বাংলাদেশ অবশ্যই পরিবেশ রক্ষা করবে, নদী–খাল–জলাশয় সংরক্ষণ করবে, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবে, পরিকল্পিত নগরায়ন করবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মূল দায় যাদের, অর্থাৎ উন্নত ও উচ্চ–নিঃসরণকারী দেশগুলোর, তাদের দায়িত্ব আরও অনেক বেশি। শুধু বক্তৃতা, সম্মেলন ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে হবে না; দরকার বাস্তব অর্থায়ন, সহজ শর্তে প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ।
জলবায়ু অর্থায়নকে ঋণের ফাঁদে পরিণত করা যাবে না। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে ঋণ দিয়ে বলা যাবে না, নিজেদের রক্ষা করো। কারণ যে ক্ষতি বাংলাদেশ ভোগ করছে, তার বড় অংশ বাংলাদেশের সৃষ্টি নয়। জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে অনুদানভিত্তিক, সহজলভ্য, দ্রুতপ্রাপ্ত এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, কৃষক, মৎস্যজীবী, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ এবং জলবায়ু–বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে কেন্দ্র করে অভিযোজন কর্মসূচি নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সাধারণত দুটি বড় পথের কথা বলা হয় অভিযোজন এবং প্রশমন। অভিযোজনের অর্থ হলো পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার সক্ষমতা তৈরি করা। যেমন উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, লবণাক্ততা–সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, নিরাপদ পানির উৎস তৈরি, জলাবদ্ধতা কমানো, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা। অন্যদিকে প্রশমন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ কমানো, যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বন ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ, দূষণ কমানো এবং কম–কার্বন উন্নয়নপথ গ্রহণ করা।
কিন্তু অভিযোজন ও প্রশমন, দুটিই ব্যয়বহুল এবং উচ্চ কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত। উন্নত বিশ্বের মতো শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণা সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তাই বাংলাদেশ একা নিজের উদ্যোগে এই সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান করতে পারবে না। যারা সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাই–অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে, তাদের কাছ থেকে অনুদানভিত্তিক আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বাস্তব সহযোগিতা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর পক্ষে কার্যকর জলবায়ু অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করা সহজ হবে।
এ বছরের থিমে প্রকৃতি থেকে সমাধান খোঁজার কথা বলা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রকৃতি থেকে সমাধান একটি ধীর, সময়সাপেক্ষ এবং পরিকল্পনানির্ভর প্রক্রিয়া। ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, উপকূলে সবুজ বেষ্টনী তৈরি, নদী–খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, পাহাড় ও বন রক্ষা, নগরে বৃক্ষায়ন, জলাধার সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যভিত্তিক অভিযোজন এসব প্রকৃতিনির্ভর সমাধান কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের জন্যও অর্থ, জমি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, গবেষণা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দায়িত্বও কম নয়। জলবায়ু ন্যায়ের দাবি করতে হলে নিজেদের ঘরও গোছাতে হবে। নদী দখল, খাল ভরাট, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জলাশয় ধ্বংস, এসব কাজ জলবায়ু ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক দায় যতই বড় হোক, স্থানীয় অব্যবস্থাপনার দায় এড়ানো যায় না। চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা, তাপদাহ ও বায়ুদূষণ আজ মানুষের জীবনমানকে সরাসরি আঘাত করছে। তাই স্থানীয় সরকার, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬–এ বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত দ্বিমুখী– একদিকে উন্নত দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ন্যায্যতা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি দাবি; অন্যদিকে দেশের ভেতরে প্রকৃতি ধ্বংস, দখলদারিত্ব ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। আমরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান দায়ী নই, কিন্তু আমাদের নদী, খাল, বন, পাহাড় ও নগর পরিবেশ নষ্ট হলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত আমাদের জনগণকেই বহন করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর কাছে করুণা নয়, ন্যায়বিচার দাবি করে। উন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের ধোঁয়া আজ বাংলাদেশের আকাশে দুর্যোগ হয়ে ফিরে আসছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের দিনে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কোনো দান–খয়রাতের বিষয় নয়; এটি ঐতিহাসিক দায়, নৈতিক দায়িত্ব এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
বাংলাদেশ কাজ করবে, কিন্তু একা নয়। বাংলাদেশ প্রকৃতি রক্ষা করবে, কিন্তু অর্থ ও প্রযুক্তি ছাড়া অসম যুদ্ধ লড়তে পারবে না। বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে চায়, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশের নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের, বিশেষ করে উন্নত ও উচ্চ–নিঃসরণকারী দেশগুলোর। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬–এ তাই বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হওয়া উচিত স্পষ্ট, দৃঢ় ও ন্যায়ভিত্তিক: জলবায়ুর দায় যার, দায়িত্বও তার; আর যে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত, তার পাশে দাঁড়ানোই আজ সভ্যতার পরীক্ষা।
লেখক : পরিবেশ–বিশেষজ্ঞ; সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।










