ছড়াবিষয়ক কর্মশালা ও চিরনতুন ছড়ার চর্চা

রাশেদ রউফ | মঙ্গলবার , ১৯ মে, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

ছড়াশৈলীর উদ্যোগে নগরে ছড়াবিষয়ক একটি কর্মশালা শুরু হয়েছে। ছড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো ও ছড়া লেখার কলাকৌশল নিয়ে এই কর্মশালায় আলোচনা হচ্ছে। প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে সম্প্রতি। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হচ্ছে ২২ মে। আমার ভালো লাগার বিষয় এখানে যে, ছড়া লেখার প্রতি লেখকদের আগ্রহ দেখে। শুধু নতুনরা এতে অংশ নিচ্ছেন না, অনেক প্রবীণ লেখক অংশ নিচ্ছেন কর্মশালায়।

ছড়া শব্দটির উৎপত্তি, সংজ্ঞা ও স্বরূপ নির্ধারণ বহুল আলোচিত বিষয়। কারো কারো মতে ‘ছটা’ শব্দ থেকে শব্দটি উদ্ভূত। যার অর্থ হলো শ্লোক পরম্পরা বা ছন্দোবদ্ধ পদপরম্পরা। সেক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনটি এরকম : ছটা > ছডা > ছড়া।

আবার কোনো কোনো পণ্ডিতের ধারণা ‘ছন্দ’ থেকে ‘ছড়া’ শব্দটি এসেছে। ‘ছন্দ’ শব্দের অপভ্রংশ রূপ হলো ‘ছড়া’। আসলে বাংলা ছড়ার জন্ম পরিচয় উন্মোচন করতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় হাজার বছরের অতীত লোকালয়ে। আবহমান বাংলার লোকালয়ই ছড়ার উৎসমুখ। লোকজীবন থেকে উৎসারিত স্বতঃপ্রবাহিত নির্ঝরিণীর মতোই তার গতি প্রকৃতি। তার শরীরে চিরায়ত রূপ প্রবহমান। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ছড়ার মধ্যে একটা চিরত্ব আছে। কোনোটির কোনোকালে কোনো রচয়িতা ছিল বলিয়া পরিচয়মাত্র নাই এবং কোন্‌ তারিখে কোনটা রচিত হইয়াছিল এমন প্রশ্নও কাহারও মনে উদয় হয় না। এই স্বাভাবিক চিরত্বগুণে ইহারা আজ রচিত হইলেও পুরাতন এবং সহস্র বৎসর পূর্বে রচিত হইলেও নূতন।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ছেলেভুলানো ছড়া, লোকসাহিত্য]। এই চিরপুরাতন ও চিরনতুন ছড়া কখনো আনন্দ উল্লাসে, কখনো উত্তেজনায়, কখনো ব্যঙ্গকৌতুকে মুখে মুখে তৈরি হতো। গাওয়া হতো সুরে সুরে আবেগে উচ্ছ্বাসে। সুরের আমেজে কখনো ছড়া হয়ে উঠেছে শ্লোক, কখনো কখনো গান। ‘সর্বপ্রকার প্রকাশভঙ্গির সর্বজনস্বীকৃত চিরাচরিত ভঙ্গি’ হিসেবে ছড়া হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়।

ছড়ার উৎপত্তি নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ছড়া ছিল মৌখিক ও লৌকিক ঐতিহ্য। তা লেখা হতো না, কেবল গাওয়া হতো। লোকমুখে প্রচলিত বা লোকসাহিত্যের এসব ছড়াকে সংগ্রহ করে সর্বপ্রথম লৈখিক রূপ দেন বাংলা ছড়ার প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ যোগীন্দ্রনাথ সরকার। তিনি ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে এসব সংগৃহীত ছড়াকে ‘খুকুমণির ছড়া’ শীর্ষক একটি গ্রন্থে সংকলিত করেন। সেই গ্রন্থের ভূমিকায় ছড়াকে প্রথমবারের মতো সাহিত্যের বিষয় বলে উল্লেখ করেন আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। তিনি ভূমিকায় আরও লিখেছেন, “…কিছুদিন হইতে অনন্যসাধারণ প্রতিভায় পরমশ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় এই জাতীয় কবিতা সংগ্রহের অভাব অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভব করিয়া আসিতেছিলেন। …. তিনি স্বয়ং সংগ্রহকার্যে নিযুক্ত ছিলেন; এবং তাঁহারই প্ররোচণায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ত্রৈমাসিক পত্রিকায় কিছুদিন এই সংগ্রহ প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয়। কিন্তু কী কারণে জানি না, কাজটা অধিক দূর অগ্রসর না হইয়াই থামিয়া যায়….”। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর এই ভাষ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রবীন্দ্রনাথই বাংলা ছড়ার প্রথম সংগ্রাহক। সৌগত চট্টোপাধ্যায়ও ‘বাংলার ছড়া, ছড়ার বাংলা’ গ্রন্থের সম্পাদকীয়তে সেই কথার প্রতিধ্বনি করে বলেন, “তিনিই (রবীন্দ্রনাথ) আমাদের ছড়ার প্রথম সচেতন সংগ্রাহক, আলোচক ও পরবর্তীকালে ছড়া বিষয়ক আলোচনার মুখ্য গতি নিয়ামক।”

ছড়াসাহিত্যের ইতিহাস পাঠে দেখা যায় যে, ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা ছড়া কাজ করেছে প্রধানত শিশুরঞ্জনী হিসেবে। নির্মল সাহিত্যরস পরিবেশনের পাশাপাশি শিশুদের নৈতিক শিক্ষাদানের প্রতি সে সময় বিশেষ সচেতনতা ছিলো। অবশ্য এ সময়ের ভেতরেই বাংলা ছড়া আধুনিক রূপেগন্ধে পূর্ণতা লাভ করে ছড়াসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল সুকুমার রায়ের হাতে। শব্দ চয়নে, ছন্দে, ব্যঞ্জনায় এবং বিষয়বৈচিত্র্যে তিনি বাংলা ছড়ায় আনেন নতুন গতি। সুকুমার রায়ের নিরবচ্ছিন্ন অপূর্ব কৌতূহলোদ্দীপক ব্যঙ্গনিপুণ সরস লেখনী ছটা ছড়াকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আঙ্গিকে সাহিত্যমাধ্যমের মর্যাদা এনে দিলেও ছড়া তখনো বেরোতে পারে নি তার শিশু অনুষঙ্গের গণ্ডি থেকে। ‘সুদ খায় মহাজন ঘুষ খায় দারোগায়’এ ধরনের কিছু কিছু পঙ্‌ক্তিতে ভিন্নধর্মী সুর তাঁর ছড়ায় লক্ষ করা যায়। কিন্তু রচনার সংখ্যার তুলনায় এসব পঙ্‌ক্তি এতোই নগণ্য যে, সেগুলো আলাদাভাবে তুলে ধরা যায় না।

আদি ছড়ার যে বিষয় এবং শিশু মনমানসিকতার পরিতুষ্টি সাধনের যে চিন্তাচেতনা, তার পরিবর্তন ঘটতে থাকে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। আস্তে আস্তে ছড়ায় ঢুকতে থাকে সমকালীন বিষয়আশয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা, ক্ষোভ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে ছড়ায়। মানুষের মুখে মুখে যে ছড়া গাওয়া হতো, কালের পরিক্রমায় সেটি চলে এসেছে কলমের মুখে, উঠে এসেছে পোস্টারে, ছড়িয়ে পড়েছে দেয়ালেদেয়ালে। সেই জন্যেই ড. আশরাফ সিদ্দিকীর এক প্রবন্ধে দেখি, ‘ছড়া শুধু সমাজ সংসার নিয়ে বলে না, দেশ ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বলে।ছড়াও কালের সাথে অনবরত তার রূপ বদলায়।’ [আবহামান বাংলা / . আশরাফ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ]

অবশ্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ অনেক আগেই ছড়াকে মেঘের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘উভয়েই পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণেরঞ্জিত, বায়ুস্রোতে যদৃচ্ছ ভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কলাবিচার শাস্ত্রের বাহির, মেঘ বিজ্ঞানও শাস্ত্র নিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই। অথচ জড় জগতে এবং মানব জগতে এই দুই উচ্ছৃঙ্খল অদ্ভুত পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে।’ [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ছেলে ভুলানো ছড়া]

ছড়ার প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে ছড়াকে বহুমুখী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ছড়াশিল্পী অন্নদাশঙ্কর রায়।

তেলের শিশি ভাঙলো বলে

খুকুর ‘পরে রাগ করো

তোমরা যারা বুড়ো খোকা

ভারত ভেঙে ভাগ করো

তার বেলা, তার বেলা?

এ ধরনের ছড়া লিখে অন্নদাশঙ্কর রায় ছড়ার মধ্যে যোগ করেন রাজনৈতিক সুর। যে ছড়া শিশুদের ঘুম পাড়ানিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সে ছড়া পরিণত হয়েছে ঘুম জাগানিয়ায়। ছড়ার ভাষাও হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার, প্রতিবাদের মাধ্যম। ছড়াসাহিত্যের এই বৈশিষ্ট্যগুলি উঠে এসেছে লোকসাহিত্যবিজ্ঞানী শামসুজ্জামান খানের এক প্রবন্ধে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা লক্ষ্য করে দেখেছি আমাদের শিশুসাহিত্যের মৌল স্বভাব বা প্রবণতাগুলো বিভিন্ন দশকে এসে এক একটা পর্যায় অতিক্রম করেছে। কথাটা এভাবেও বলা যেতে পারে যে এক একটা দশকে এসে আমাদের শিশুসাহিত্য এক বা একাধিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। মধ্য চল্লিশ থেকে মধ্য পঞ্চাশ পর্যন্ত রচিত শিশুসাহিত্যের দু’টি দিক লক্ষ্য করা যায়: এক. পুরনো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং দুই. কিছু বিচ্ছিন্ন প্রয়াস। [ভিন্ন অবলোকন, সাহিত্যের দিগ্বলয়]

সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে ছড়াও বিকশিত হয়েছে। ক্রমশ সৃষ্টি হয়েছে এর শাখাপ্রশাখা, পত্রপল্লব। এখন বিভিন্ন ভাগে আমরা বিভক্ত করি ছড়াকে। যেমন: শিশুতোষ ছড়া, উদ্ভট ছড়া, ব্যঙ্গাত্মক ছড়া, রাজনৈতিক ছড়া ইত্যাদি। কখনো শিশুরঞ্জনি, কখনো সমসাময়িক টানাপড়েন নির্ভর, কখনো রাজনৈতিক। এসব ছড়া নিয়েই আমাদের দিনকাল।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;

ফেলো, বাংলা একাডেমি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনৈতিকতার ইতিবাচক চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি