স্বাস্থ্যশিক্ষার মান বাড়লে চিকিৎসার মানও বাড়ানো যাবে বলে মন্তব্য করেছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা হচ্ছে, স্বাস্থ্যশিক্ষার মান সর্বকালের সর্বনিম্ন। সেখানে চিকিৎসা সেবার মানও সর্বকালের সর্বনিম্নে। যদি চিকিৎসকের সেবার মান এমন হয়, সেখানে প্যারামেডিক্স নার্সদের সেবার মান ভালো হবে আশা করা যায় না। সুতরাং আমাদের চিকিৎসা শিক্ষার অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাস্থ্যশিক্ষার মান বাড়লে চিকিৎসার মানও বাড়াতে পারবো।’ কথাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয়ে থাকে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সূতিকাগার। স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী অবকাঠামো ও বিশেষ সক্ষমতা নিয়ে তৈরি। চিকিৎসাবিশ্লেষকরা বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা গবেষণার তিন লক্ষ্যের সমন্বয়ে রোগীদের উচ্চমান ও সর্বশেষ আধুনিক চিকিৎসা প্রদান, উচ্চ দক্ষতার চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবী তৈরি করা এবং গবেষক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই তিন লক্ষ্যের ঊর্ধ্বে নতুন উদ্ভাবন, সর্বশেষ আবিষ্কৃত প্রযুক্তির প্রচলনও পরিবর্তনের ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে নির্দেশনা দানসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। তবে উন্নত স্বাস্থ্যের জন্য শুধু স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, যে কোনো মানুষের স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। কেননা স্বাস্থ্যশিক্ষার লক্ষ্য হলো মানুষকে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে স্বাবলম্বী করা, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের ও সমাজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে পারে।
আনন্দের খবর, এই স্বাস্থ্যশিক্ষাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীতে যাত্রা শুরু করেছে ‘ডেভ কেয়ার ফাউন্ডেশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, স্বাস্থ্যশিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। এই শিক্ষার অভাবে সমাজে হাজার হাজার মানুষ ভুগছেন। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন লিখেন, অথচ ওষুধ খাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই রোগী কিংবা তাদের আত্মীয় স্বজনকে করতে হয়। এখন রোগী কিংবা সেবক যদি স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা না রাখেন তাহলে শুধু প্রেসক্রিপশন দিয়ে রোগীর ভালো হওয়া কঠিন অথবা ওষুধের যেভাবে ফল পাওয়ার কথা সেভাবে পাচ্ছেন না। ডেভ কেয়ারের মাধ্যমে আমরা শুধু রোগী বা নার্স নয়, সাধারণ মানুষকেও স্বাস্থ্যশিক্ষায় সচেতন করতে চাই। আমরা এটিকে একটি সামাজিক বিপ্লবে পরিণত করতে চাই। তিনি ডেভ কেয়ারকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আমাদের সামর্থ্য সীমিত। তাই আমরা পূর্ব রেজিস্ট্রেশনের ভিত্তিকে যে কাউকে স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের প্রশিক্ষণ ফ্রি, তবে আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
নগরীর ও আর নিজাম রোডস্থ গোল পাহাড় মোড়ের সন্নিকটে গড়ে তোলা ডেভ কেয়ারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করে বলেন, আমরা কিছু চিকিৎসক চেম্বারের অর্ধেক ফি’তে এখানে চিকিৎসাসেবা প্রদান করবো। সপ্তাহের একেকসময় একেকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেবা দেবেন। তবে একজন রোগী যে অর্ধেক ফি দেবেন তাও ওই চিকিৎসক নেবেন না। তিনি ফ্রি রোগী দেখবেন, ফি’র ওই টাকা দিয়ে আমরা ডেভ কেয়ার পরিচালনা করবো।
আসলে, স্বাস্থ্য সেবার চেয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষার গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। বরং বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের মতো দেশ, যেখানে মানুষের আবেগ ও সরল অন্ধ বিশ্বাস, অশিক্ষা আর অজ্ঞতাকে পুঁজি করে শুধু ব্যবসার উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য, ডাক্তারের ডিগ্রি ও চিকিৎসাকে পানির দরে বেঁচা হয় হাটে ও মাঠে–ঘাটে, সেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে মানবতার সেবার জন্য সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে কাউন্সেলিং করা জরুরি। এ ছাড়া স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।
রোগীর ব্যক্তি পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের মোট ব্যয় দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বহন করবে সরকার এবং ৩০ শতাংশ ব্যয় রোগী বহন করবে এমন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমানোর পরিবর্তে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবস্থায় চিকিৎসার জন্য রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে আনা জরুরি। রোগীরা চিকিৎসার জন্য বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় করেন ওষুধ ক্রয়ে ও নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষায়। ডেভ কেয়ার ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের গাইডলাইন অনুসরণ ও চিকিৎসা চালু করতে পারলে রোগীর ব্যক্তি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব।








