দিগন্তজোড়া ধূসর বালুরাশি আর মাথার ওপর আগুনের গোলার মতো জ্বলতে থাকা সূর্য। মরুভূমির দেশ ওমান বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন এক প্রতিচ্ছবি। যেখানে পানির প্রতিটি ফোঁটা মূল্যবান আর সাধারণ ঘাস জন্মানোটাই চ্যালেঞ্জ, সেখানে ফলল বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। এ রোমাঞ্চকর কাহিনি ঘটেছে দেশটির আল সুইক অঞ্চলে। চট্টগ্রামের আনোয়ারার প্রবাসী মোহাম্মদ সেলিম তার ৫ বছরের শ্রমে মরুর বুকে ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলাদেশের চিরচেনা সেই দৃশ্য। খবর বিডিনিউজের।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায়, কাঁঠাল হলো আর্দ্র ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুর ফল। এর আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বৃষ্টিবহুল বনাঞ্চল। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মরুভূমিতে কাঁঠাল চাষ করা দুঃসাধ্য এক কাজ। কারণ, কাঁঠাল গাছের জন্য প্রয়োজন গভীর ও উর্বর দোআঁশ মাটি এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত। অন্যদিকে ওমানের মাটি মূলত বালুকাময় এবং ক্ষারীয়, যা গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণে বাধা দেয়। এর ওপর রয়েছে তীব্র লবণাক্ত পানি এবং গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাওয়ার মতো প্রতিকূলতা।
এমন তীব্র তাপমাত্রায় গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু মোহাম্মদ সেলিম দমে যাননি। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের মমত্ববোধকে পুঁজি করে তিনি রীতিমতো লড়াই করেছেন প্রকৃতির এই বৈরিতার বিরুদ্ধে।
পাঁচ বছর আগে যখন তিনি শখের বশে কয়েকটি কাঁঠালের চারা রোপণ করেন, তখন প্রতিবেশীরা তো বটেই, অনেক অভিজ্ঞ কৃষিবিদও বিষয়টিকে পাগলামি বলে মনে করেছিলেন। শুরুতে অনেক প্রতিকূলতা এলেও ধৈর্য হারাননি সেলিম। নিয়মিত পরিচর্যা আর পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি মরুভূমির বালুমাটিকেই কাঁঠাল চাষের উপযোগী করে তোলেন। আজ সেই গাছগুলো ফলে ফলে ভরে উঠেছে। প্রবাসীদের মতে, মরুভূমিতে উৎপাদিত এই কাঁঠালের আকার, গায়ের রঙ এবং কোষের মিষ্টতা বাংলাদেশের কাঁঠালের মতোই। খামারের চারপাশ জুড়ে এখন পাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুবাস, যা প্রবাসীদের ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজ দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
নিজের এই প্রাপ্তি নিয়ে আবেগাপ্লুত মোহাম্মদ সেলিম। তিনি জানান, এটি তার কাছে কেবল ফল নয়, বরং পরবাসে নিজ দেশের স্মৃতি ও ভালোবাসার প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করেন, মরুর মাটিতে কাঁঠাল ফলানো সম্ভব হয়েছে কেবল পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের কারণে। তার এই সাফল্য দেখে এখন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন।
আরেক প্রবাসী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের কৃষকদের মেধা ও শ্রম দুই–ই আছে। মরুভূমির মতো প্রতিকূল পরিবেশে এমন চাষাবাদ প্রমাণ করে যে, সঠিক কৌশল জানা থাকলে প্রতিকূল পরিবেশেও সফল হওয়া সম্ভব। তবে ওমানের মাটিতে কাঁঠাল ফলানোর এই স্বপ্নযাত্রা নতুন নয়; দেশটির স্থানীয় কৃষকরাও এখন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছেন। ওমানের কৃষি বৈচিত্র্যকরণের অংশ হিসেবে দক্ষিণ ওমানের সালালাহ অঞ্চলেও কয়েক বছর ধরে কাঁঠালের ফলন হচ্ছে।
২০২২ সালের নভেম্বরে স্থানীয় গণমাধ্যম মাস্কাট ডেইলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমানি কৃষক আহমেদ সাঈদ মাসউদ আল কাথিরি তার খামারে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের ৯টি ভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩০০টি কাঁঠাল গাছ রোপণ করে সফল হয়েছেন।














