২০১৮ সালের ৫ জুন দুই বছর মেয়াদি রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর প্রায় ৮ বছরের মাথায় নতুন কমিটি পেল জেলা ছাত্রদল। শনিবার (২ মে) দিবাগত রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ফেসবুক পেজে ঘোষিত রাঙামাটি জেলার আংশিক কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ২৩ জন নেতা। যাদের অধিকাংশই বিবাহিত বলে অভিযোগ উঠেছে। রাতভর নানান বিতর্ক–সমালোচনার পর নতুন ঘোষিত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে রোববার সকালে বিক্ষোভ হয়েছে রাঙামাটি শহরে। জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধের কারণে এদিন দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
২ মে দিবাগত রাতে ঘোষিত রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে মো. অলি আহাদকে সভাপতি, নাঈমুল ইসলাম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৩ সদস্যের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। এরমধ্যে সভাপতি মো. অলি আহাদ রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম রনি রাজস্থলী উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক।
নতুন কমিটিতে সিনিয়র সহসভাপতি পদে খায়রুল ইসলাম রানা, সহসভাপতি পদে জ্যোতি চাকমা, মো. বাশার আজম, মাহমুদুল হাসান জুয়েল, রাজন রক্ষিত, আব্দুস সালাম, তামিম শাহরিয়ার, আমিনুল ইসলাম, রানা পাল, সুমন হোসাইন, নূর তালুকদার মুন্না, মো. ইসহাককে রাখা হয়েছে। এছাড়া সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস শাকুর জাবেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে হাসান ইমরান, মো. শফিকুল ইসলাম, মোখতার আহমেদ, মো. পারভেজ হোসেন সুমন, মো. সাজিদ ইমতিয়াজ ও সাংগঠনিক সম্পাদক গালিব হাসান, প্রচার সম্পাদক আব্দুল আহাদ ও দপ্তর সম্পাদক পদে সানি আহমেদকে রাখা হয়েছে। নতুন কমিটিকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা ছাত্রদলের কমিটি ১৫১ সদস্যের হয়ে থাকে। প্রায় ৮ বছরের মাথায় রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর রাত থেকেই নতুন কমিটিকে ‘বয়কট’, নেতা নির্বাচনে স্বেচ্ছাচারিতা ও বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন নেতাকর্মীরা।
শনিবার রাতে কমিটি ঘোষণার পর রোববার বেলা ১১টার দিকে পৌরসভা এলাকা থেকে ‘অপহরণকারী, চাঁদাবাজ, বিবাহিত ও অছাত্রদের নিয়ে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠনের প্রতিবাদে’ বিক্ষোভ করেছেন নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভ মিছিলটি রাঙামাটি জেলা শহরের কাঁঠালতলীতে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে আসলে ঘটে তুলকালাম কাণ্ড। নতুন ঘোষিত আংশিক কমিটির বিরোধিতা করে প্রধান সড়কে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদলের একাংশ। এসময় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও বিভিন্ন প্লেকার্ড উত্তোলন করে কমিটির গঠনের প্রতিবাদ জানান নেতাকর্মীরা।
বিক্ষোভ থেকে নেতাকর্মীরা ‘অপহরণকারী, মাদককারবারি, বিবাহিতদের কমিটি মানি না; আইফোন ও টাকার কাছে হেরে গেল ত্যাগীরা; চাঁদা লাগলে চাঁদা নে, নতুন করে কমিটি দে’ এমন সব স্লোগান দেন। বিক্ষোভের কারণে বেলা ১১টা থেকে পৌনে দুইটা পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে এবং যানজট সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ জনগণ।
বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে আন্দোলনকারীরা ঘোষিত কমিটি বাতিল করে ত্যাগী ও যোগ্যদের নিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। এসময় সড়ক থেকে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সরাতে বারবার চেষ্টা করেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ মামুন ও সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম পনির। মামুন–পনির দুজনই ঘটনাস্থলে এসে নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন। শেষে ‘বিষয়টির সমাধান করা হবে’ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের এমন আশ্বাসের পর সড়ক ছাড়েন কর্মীরা।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সদ্যবিদায়ী কমিটির কোষাধ্যক্ষ মো. হেলিম মিয়া বলেন, আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। চেয়েছিলাম একটি সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হবে। যে কমিটি দিয়েছে তারা অনেকে বিবাহিত। যোগ্যদের কমিটিতে আনা হয়নি। অবিলম্বে এ কমিটি বাতিল করে যোগ্যদের নিয়ে কমিটি করতে হবে।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদ প্রত্যাশী ও সদ্যবিদায়ী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফজরুল ইসলাম বলেন, আমরা চেয়েছিলাম ছাত্রনির্ভর একটি সুন্দর কমিটি করব। যেখানে আমাদের ছাত্রদলের ত্যাগী ও দুঃসময়ের কাণ্ডারিদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু কেন্দ্র থেকে দেয়া কমিটিতে ছাত্রনির্ভর ছাত্রদল হয়নি, বিপরীতে দেখা গেছে আংশিক কমিটির ৭০ শতাংশই বিবাহিত। আমরা চাই জেলা ছাত্রদলের একটি সুন্দর ও শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হোক। এর সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ত্যাগী নেতাকর্মীরা আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের নতুন ঘোষিত কমিটির সভাপতি মো. অলি আহাদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘসময় বিরোধী দলে ছিলাম, আমাদের নেতাকর্মীরা সবাই দুঃসময়ের কাণ্ডারি। সবারই দলের জন্য ত্যাগ রয়েছে। এখন যেহেতু কমিটি হলো, সেখানে তো সবাই সভাপতি–সাধারণ সম্পাদক হতে পারবেন না; তবে সবার যার যার জায়গা থেকে প্রত্যাশা থাকবে এটা স্বাভাবিক। আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করব। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ছাত্রলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।’
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নতুন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ করেছে। আমি তাদের বুঝিয়েছি, নিজেদের পাওয়া না পাওয়াকে কেন্দ্র করে আমরা তো সড়ক অবরোধ করতে পারি না। সাধারণ মানুষের তো এখানে দায় নেই, আমরা তো তাদের কষ্ট দিতে পারি না। এরমধ্যে আমরা সরকারি দলেও আছি। তাদের বোঝানোর পর নেতাকর্মীরা সড়ক ছেড়েছে। আর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আমি কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের মন্ত্রী মহোদয় (দীপেন দেওয়ান) বিষয়টি দেখছেন। আশা করছি এটার একটা সুন্দর সমাধান হবে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে ফোন দিলে তিনি কিছুক্ষণ পর কল দেবেন বলে কেটে দেন। পরবর্তীতে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।














