চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকায়। এটি সড়ক দুর্ঘটনার ‘হট স্পট’ হিসেবে পরিচিত। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাঙ্গালিয়া এলাকায় একাধিক তীক্ষ্ণ বাঁক, ঢাল ও উঁচু–নিচু অংশ রয়েছে। এসব জায়গায় হঠাৎ গতি কমাতে না পারলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। রাস্তার দুই পাশে ঘন ঝোপঝাড় ও বন থাকায় সামনে কী আছে তা দূর থেকে বোঝা কঠিন হয়। বিশেষ করে রাতে এই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রাতে স্ট্রিট লাইটের স্বল্পতা বড় সমস্যা। অন্ধকারে বাঁক, গর্ত বা অন্য যানবাহন সময়মতো চোখে পড়ে না। দীর্ঘ সোজা রাস্তায় গতি বাড়িয়ে হঠাৎ বাঁকে এসে অনেক চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতাও দুর্ঘটনার বড় কারণ। এই মহাসড়কে নিয়মিত বাস–ট্রাক চলাচল করে। ভারী যানবাহনের গতি ও ব্রেকিং দূরত্ব বেশি হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড, রোড মার্কিং বা স্পিড নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপ্রতুল।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাঙ্গালিয়া এলাকাটি বন্য হাতির চলাচলের নির্দিষ্ট করিডোর, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা অনুসরণ করে। এই করিডোরে হঠাৎ করে মানবসৃষ্ট বাধা ও লাইটের আলোতে আলোকিত হলে তা হাতির আচরণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। হাতি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণী। সামান্য পরিবর্তনেও তারা দ্বিধায় পড়ে চলাচলের পথ বদলে ফেলে। নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করতে হলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। হাতির জন্য পরিচিতি, নিরিবিলি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ না থাকলে হাতিরা সেই পথ পরিহার করে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ–সহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফ জানান, জাঙ্গালিয়ায় ৯শ মিটার চার লেন ও সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে জাঙ্গালিয়ার আগের অংশ পর্যন্ত মহাসড়কের উভয় পাশে ৬ ফুট করে বৃদ্ধির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে উক্ত প্রকল্পের কাজ শেষে হবে।
পিচ্ছিল মহাসড়ক : উপকূলীয় অঞ্চল টেকনাফ, মহেশখালী, উখিয়া ও চকরিয়া থেকে সড়কপথে লবণ পরিবহনের সময় নিঃসৃত লবণযুক্ত পানি ও ড্রাম্প ট্রাক থেকে ঝরে পড়া কাঁচা মাটি এখন মহাসড়কের নতুন আতঙ্কের নাম। বৃষ্টির সংস্পর্শে এই লবণ–মাটির মিশ্রণ রাস্তায় এক ধরনের আঠালো, পিচ্ছিল স্তর তৈরি করে। ফলে চালক যত দক্ষই হোক, ব্রেক কষলে গাড়ি স্লিপ করে। অনেক সময় স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। নিয়ম না মেনে লবণ ও মাটি পরিবহন এবং সড়ক পরিষ্কার না হওয়ায় এই পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। প্রতিদিন মহাড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট–বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণ ও পানির মিশ্রণে রাস্তার ঘর্ষণ শক্তি কমে যায়, যা সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই ঝুঁকি আরো ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
দুর্ঘটনার পর লুটপাট : চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনার পরই হতাহতদের মালামাল লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার পর যেখানে আহতদের দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে ঘটে উল্টো ঘটনা। জাঙ্গালিয়ায় মাইক্রো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার পর গতকাল হতাহতদের মালামাল লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ৭ এপ্রিল মহাসড়কে উপজেলার আধুনগর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নাসিবুর রহমান নাছির (৪৮) নামে এক বাইক আরোহী নিহত হওয়ার পর তার মোবাইল ও মানিব্যাগ লুট হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর ধারণকৃত ছবি যাচাই করে লুট করা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছু অসাধু ব্যক্তি ঘটনাস্থলে ছুটে এসে সাহায্যের পরিবর্তে হতাহতদের সাথে থাকা টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। আহতরা তখন জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকলেও তাদের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে একটি চক্র। এতে করে একদিকে যেমন মানবিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে আহতদের চিকিৎসা পাওয়াও বিলম্বিত হচ্ছে। এটি শুধু অপরাধ নয়, চরম অমানবিকতার উদাহরণ। দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো, ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।














