বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিহাসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন, তার পূর্ণতা লাভ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর হাতে। তাঁর সাহিত্যজগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো নারী চরিত্রের এমন বহুমাত্রিক ও গভীর উপস্থাপন, যা বাংলা সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি বরং বিশ্বসাহিত্যের পরিসরেও বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে। সাহিত্যের ভীষণ টালমাটাল সময়ে তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন। তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যে সমুজ্জ্বল। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ এক একটি সাহিত্যধারা।
বাংলা সাহিত্যে নানামুখী সৃষ্টির জন্য বিখ্যাত যিনি, তিনিই বাংলা সাহিত্যে নারীকে নিয়ে গেলেন এক অনন্য উচ্চতায়। তাঁর বেশির ভাগ সৃষ্টি নারী কেন্দ্রিক। নারীর এত ভিন্ন ভিন্ন রূপ, আর কেউ সৃষ্টি করতে পারেন নি। নারী চরিত্রের আধুনিকায়ন তাঁর হাত ধরেই এলো বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনে। তবে বলে রাখা ভালো, রবীন্দ্র পূর্ববর্তী বাংলা উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাস সমূহে নারী চরিত্র সৃষ্টিতে ভীষণ পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পূর্ণ যৌবনে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। সেই সময় তিনি বঙ্কিম ধারায় যে প্রভাবিত হননি, তা বলা যায় না। অর্থাৎ নারী চরিত্রের এমন নিপুণ সৃষ্টির জন্য রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাবে খানিক প্রভাবিত হয়েছেন, পরবর্তীতে যা রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রতীয়মান হয়। সাহিত্য রচনায় অগ্রজ অনুজের এমন অনুকরণ বা প্রভাবিত হওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক একটা বিষয়। এতে দোষের কিছুই নেই। আবার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ সমসাময়িক ঔপন্যাসিক ছিলেন। কিন্তু নারী চরিত্র সৃষ্টিতে দুইজনের মধ্যে একটা বিশাল ফাঁক সুস্পষ্ট। দুইজন দুইটি সমাজব্যবস্থার আবহে নারী চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে তখন উঠে এসেছিলো, তৎকালীন সমাজব্যবস্থার বাস্তবতায় নারী সমাজের ত্যাগ–তিতিক্ষার গল্প। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্তশ্রেণির গল্পই বেশি।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ তুলে এনেছিলেন নব্য শিক্ষিত আধুনিক সভ্যতার নবজাগরণে তৎকালীন উচ্চমার্গীয় সমাজে মেয়েদের ক্রমবর্ধমান বিকাশের ধারা। আর স্বাভাবিকভাবেই পাঠক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে সমাজে নিগৃহীত নারী সমাজের চোখের জলে সয়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া আটপৌরে নারী সমাজের গল্পের চেয়ে পাটভাঙা শাড়ি পরিহিতা, শিক্ষিতা, অচলায়তনের শৃঙ্খল ভেঙে আলোক অভিমুখে এগিয়ে আসা নারীদের গল্পকেই পছন্দ করলেন বেশি। তাই তুলনামূলকভাবে শরৎচন্দ্রের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে আছেন।
রবীন্দ্র সাহিত্যের এমন বিস্তৃত ভুবনে নারীর অগ্রযাত্রা বা নারীর ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্যময় চরিত্রে আবির্ভূত হওয়া নিতান্তই রবীন্দ্রনাথের এক অনবদ্য ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই নারী অন্তঃপুরবাসিনী থেকে আত্মপ্রকাশ করলো পৃথিবীর আলোয়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের উপন্যাসগুলি যেমন ‘বৌ ঠাকুরাণীর হাট’ বা ‘রাজর্ষী’ তে রবীন্দ্রনাথের মতো করে আমরা তাঁকে পাইনি। তাঁর পুরো উপন্যাস জুড়েই ছিলো বঙ্কিমচন্দ্রের প্রচ্ছন্ন প্রভাব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী উপন্যাসগুলোতে তাঁর সেই প্রভাবজনিত দুর্বলতা কাটতে থাকে। তাই রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের সমালোচনায় এই দুই উপন্যাস প্রায়ই উহ্য থাকে। এই দুই উপন্যাসে নারী চরিত্রের তেমন উজ্জ্বলতাও নেই। তাঁর পরবর্তী উপন্যাস বা ছোটো গল্প, কবিতা প্রভৃতি সাহিত্যকর্মে নারী চরিত্রের আধিপত্য লক্ষ্যণীয়।
শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময়োত্তীর্ণ লেখক যাঁর সাহিত্যকর্মের সূচনালগ্ন থেকে সমাপ্তিকাল পর্যন্ত লেখায় নারীর বিচিত্র জীবন পরিচয় ও তাঁদের বিবর্তিত রূপ অঙ্কিত হয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথের হাতেই বাংলা সাহিত্য কিছু ভিন্ন ধর্মী নারী চরিত্র লাভ করলো, যারা এই সময়ে এসেও অবিশ্বাস্য রকমের প্রাসঙ্গিক। তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে নারী চরিত্রগুলোকে সৃষ্টি করেছেন। পোশাক থেকে শুরু করে তাদের মুখের ভাষার আদলেও এনেছেন অবিস্মরণীয় পরিবর্তন। এই নারী চরিত্রগুলোকে মিলিয়ে ফেলা যায় না। তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র।
নারীকে সাহিত্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রে রূপায়িত করার প্রথম সার্থক দুঃসাহস রবীন্দ্রনাথের। তিনি নারীকে যুগের চেয়েও অধিকতর অগ্রসরমান করে গড়ে তুলেছেন। উনিশ শতকে যেখানে নারীর অধিকার প্রায় অকল্পনীয় সেখানে রবীন্দ্রনাথ নারীকে উপস্থাপন করেছেন স্বাধীনচেতা, প্রগতিশীল, প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে। রবীন্দ্র গবেষকদের মতে, ব্যক্তিজীবনে ঠাকুরবাড়ির নারীদের মধ্যে এমন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখেছিলেন বলেই তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রের মধ্যে কাদম্বরী, জ্ঞানদানন্দিনী, স্বর্ণকুমারী, সরলা ঘোষাল, ইন্দিরা দেবী, স্ত্রী মৃণালিণী দেবী, কন্যা মাধুরীলতা, রেণুকা, মীরাদেবীর ছায়া প্রতিফলিত হয়েছে।
সাহিত্যিক মাত্রই তার আশপাশের পরিবেশ, প্রকৃতিকে উপজীব্য করে যে কোনো সাহিত্য রচনা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথও তাঁর পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই নারী চরিত্রের রূপায়ণে প্রথমত তিনি তাঁর পরিমণ্ডলে বসবাসরত নারীদের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি করা নারী চরিত্রের মধ্যে যুগের ধারাবাহিকতার প্রচ্ছন্ন ছাপ পরিলক্ষিত হয়। নারী চরিত্রের রূপকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ অনন্য, অসাধারণ। তাঁর রচিত প্রতিটি চরিত্র স্বতন্ত্র। সে কারণেই তাঁর প্রতিটি নারী চরিত্র নিয়েই আসলে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ রয়েছে, আলাদা আলাদা করে।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য ভাণ্ডার যা আরো একশত বছর পরেও বাঙালি জীবনে প্রাসঙ্গিক থাকবে। রবীন্দ্রসাহিত্যের উপন্যাস ও ছোটো গল্পে আমরা পেয়েছি, ‘ল্যাবরেটরি’র সোহিনী, ‘দুইবোনে’র শর্মিলা ও ঊর্মিলা, ‘চার অধ্যায়’এর এলা, ‘যোগাযোগে’র কুমুদিনী, ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্য, ‘দৃষ্টিদানে’র কুমু, ‘গোরা’র সুচরিতা, ‘নষ্টনীড়ে’র চারুলতা, ‘ঘরে–বাইরে’র বিমলা, ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী। ছোট গল্পে পাই ‘স্ত্রীর পত্রে’র মৃণাল, ‘দেনাপাওনা’র নিরুপমা, ‘হৈমন্তী’র হৈমন্তী, ‘সমাপ্তি’র মৃন্ময়ী, ‘শাস্তি’র চন্দরা, রবিবারের ‘বিভা’, ‘সুভা’র সুভাষিণী সহ আরো বেশ কিছু চরিত্র। রবীন্দ্রনাটকে পাই ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীকে। তাঁর সৃষ্টি করা প্রতিটি নারী চরিত্রের আলাদা আলাদা বর্ণনা ভীষণ রকম জটিল কাজ। কারণ রবীন্দ্রনাথের নারী চরিত্রের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার প্রকোপ এতটাই বেশি, নিপুণ ভাবে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা আত্মস্থ করতে হয় ধীরে ধীরে। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এই নারী চরিত্রগুলোকে আরো বেশি মহীয়ান করে গড়ে তুলেছে। ক্রমানুসারে প্রতিটি নারী চরিত্র ধীরে ধীরে যুগোপযোগী হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থাৎ যুগের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়েছে চরিত্রসমূহে। জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রেম, প্রকৃতি, রসায়ন সবকিছুর মিলিত সম্মিলন ছিলো নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে। যার কারণে এত এত সময় পেরিয়েও তারা সমান প্রাসঙ্গিক।
পুরুষ আর নারীর মূল পার্থক্য শুধু যে শরীরবৃত্তীয়, তা রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বুঝিয়েছেন। তাই তিনি পুরুষদের সমমানে নারী চরিত্রগুলোকে ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন, যাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে একজন পুরুষের কাছে নারীকে সংকুচিত হতে না হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সার্বিক অসহযোগিতা বা নারীর অবমাননা, নারীর বঞ্চনার সদুত্তর তিনি দিয়েছিলেন কলমের আঁচড়ে। আর তাঁর এই অভিনব আয়োজনে প্রতিটি পাঠকের কাছে তিনি নারী পুরুষের সমান অধিকারের বার্তাটুকু নিশ্চিত করেতে পেরেছিলেন। তাতে করে আপামর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাণ্ডারীরা বুঝতে পেরেছিলেন নারীদের অধিকারের সপক্ষে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বর্তমান। আর নারীদের আত্মবিশ্বাসের জোগান বাড়াতে তাঁর সৃষ্টি করা প্রতিটি সাহিত্য যেনো এক একটা মাইলফলক।
নারী পাঠকের কাছে তা বেশ আত্ম জাগরণের হাতিয়ার। তারা সেইসব নারী চরিত্রের আদলে নিজেদের তৈরী করতে সচেষ্ট হতে শুরু করেছিলো। নারী চরিত্রের আধিপত্য রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে শুধুমাত্র বিস্তৃত পরিধিই দান করেনি বরং নারীর সার্বিক বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রেখে নারী পুরুষের সমান অবদানের মাধ্যমে সুন্দর একটা সমাজব্যবস্থার গোড়া পত্তনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক













