৪৩ এর দুর্ভিক্ষ ও খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী | সোমবার , ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক করুণ, হৃদয়বিদারক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। এ দুর্ভিক্ষে তীব্র খাদ্য সংকটের ফলে অসংখ্য মানুষের মর্মান্তিক জীবনাবসান ঘটে যা কেবল একটি সাময়িক মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত ব্যর্থতার এক নিষ্ঠুর প্রতিফলন। ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় এক অমোচনীয় ক্ষতচিহ্নরূপে চির অম্লান হয়ে আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল ব্রিটিশ ও জাপানি শক্তির কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। যুদ্ধকালীন সামরিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ও বিপুলসংখ্যক সৈন্যসমাবেশের ফলে এ অঞ্চলের স্বাভাবিক কৃষি ও অর্থনৈতিক উৎপাদনব্যবস্থা গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয় এবং চালসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। যেহেতু চাল ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান খাদ্য, তাই এর মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করে খাদ্যনিরাপত্তাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় নিয়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তীতে ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়। খাদ্যাভাব ও অপুষ্টির কারণে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায় এবং সমগ্র অঞ্চলজুড়ে এক করুণ ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

১৯৪৪ সালের মধ্যে এই দুর্ভিক্ষ তীব্রতর হয়ে জনজীবনের উপর সুদূরপ্রসারী ও গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিভাগের জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি এবং অবিভক্ত বাংলার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি দ্রুত অনুধাবন করেন যে, সরকারি পর্যায়ে জরুরি খাদ্য সহায়তা ব্যতীত এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। মানবিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক দৃঢ়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। পার্লামেন্টে তিনি দৃঢ় ও অকপট কণ্ঠে ঘোষণা করেন– “আমি চট্টগ্রামের সন্তান। চট্টগ্রামের মানুষ না খেয়ে মরবে, আর আমি পার্লামেন্টের পদ রক্ষার জন্য ব্রিটিশদের তোষামোদ করবতা হতে পারে না।”

পরবর্তীকালে, ১৯৪৪ সালের ৭ জুন তিনি আরও কঠোর ভাষায় মত প্রকাশ করেন

হয় চট্টগ্রামে চাল দিতে হবে,

নতুবা আমাকে হত্যা করতে হবে;

আর তা না হলে আমি এখানে কাউকে কাজ করতে দেব না।”

তাঁর উত্থাপিত এই দৃঢ় ও ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ ট্রেন ও স্টিমারযোগে সাত লক্ষ টন চাল সরবরাহ করতে বাধ্য হয়। সে সময়ের প্রভাবশালী সংসদ সদস্যবৃন্দবিশেষত শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, শ্রীমতি নেলী সেনগুপ্তা, বাবু ধীরেন্দ্র লাল দত্ত প্রমুখখান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর এই ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। সমকালীন বিশ্লেষকগণ মত প্রকাশ করেন, বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রামের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী যদি তৎকালীন দুঃসাহসিক ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় দাঁড়িয়ে জীবনবিপন্ন পরিস্থিতিতেও চট্টগ্রামবাসীর জন্য বিশেষ খাদ্যবরাদ্দ আদায়ে উদ্যোগী না হতেন, তবে দুর্ভিক্ষকালে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যাভাবজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করত।

খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ “খান বাহাদুর” ও “আমিরুল হজ্ব” উপাধিতে ভূষিত হন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

তিনি ইন্ডিয়ান রোড বোর্ড কমিটি, ক্যালকাটা পোর্ট হাজ কমিটি (পরপর তিনবার), আসামবেঙ্গল রেলওয়ে অ্যাডভাইজারি কমিটি, বেঙ্গল এক্সসাইজ স্ট্যান্ডিং কমিটি, বেঙ্গল রেভিনিউ স্ট্যান্ডিং কমিটি, বেঙ্গল এগ্রিকালচার বোর্ড, চট্টগ্রাম বিভাগীয় জেনারেল হাসপাতাল ও মেডিকেল স্কুল, চট্টগ্রাম জেলা বোর্ড, চট্টগ্রাম ইন্ডাস্ট্রি বোর্ড, বেঙ্গল ইরিগেশন স্ট্যান্ডিং কমিটি, বেঙ্গল মেডিকেল স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং চট্টগ্রাম স্কুল বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার হিসেবে ছয়বার দায়িত্ব পালন করেন এবং কলকাতাস্থ বেঙ্গল লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম অ্যান্টিম্যালেরিয়াল সোসাইটি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় জমিদার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘ সময় তিনি জেল ভিজিটর ও স্পেশাল জুরি (বিচারক) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল; তিনি ক্যালকাটার দেশপ্রিয় সুগার মিল, পটিয়া টি এস্টেট, কোঅপারেটিভ ট্রেডার্স ব্যাংক, ইন্দোবার্মা ট্রেডার্স ব্যাংক, মহালক্ষ্মী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমন ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি কলকাতাস্থ চট্টগ্রাম মুসলিম সমিতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল ও ক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

১৯২২ সালে ব্রিটিশ সরকার পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিটি মহকুমায় একটি করে ইউনিয়ন বোর্ড (বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ) চালু করলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম ইউনিয়ন বোর্ডবাঁশখালীর বৈলছড়িকাথারিয়া ইউনিয়ন বোর্ডের তিনি টানা ত্রিশ বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা তার নেতৃত্বের প্রতি জনগণের গভীর আস্থার প্রতিফলন।

১৯৬২ সালের ১৩ এপ্রিল, শুক্রবার, বাঁশখালীর বৈলছড়িস্থ পারিবারিক মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের কয়েক ঘণ্টা পর তিনি নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্যপদপ্রার্থী ছিলেন; তার নির্বাচনী এলাকা বাঁশখালী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত আটটি থানা নিয়ে গঠিত ছিল। নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও, নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ পূর্বে তার মৃত্যু ঘটায় তৎকালীন নির্বাচন কমিশন এ আসনের নির্বাচন স্থগিত করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কক্সবাজারের মৌলভী ফরিদ আহমদ চৌধুরী বিজয়ী হন।

মরহুমের স্মৃতি সংরক্ষণে ২৭২ পৃষ্ঠার জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠ করলে তার ব্যক্তিত্বের ব্যাপকতা ও বহুমাত্রিক অবদান সহজেই অনুধাবন করা যায়। ব্যক্তিজীবনে এই লৌহ মানব ছিলেন একজন সৎ, ধর্মপরায়ণ মুসলিম ; তবে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এক উদার মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর পরিচয় সুপ্রতিষ্ঠিত। ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি অনুগত থাকার পাশাপাশি তিনি আজীবন মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিবেদিত রাখেন।

তিনি পবিত্র আরব ভূখণ্ড থেকে আগত হযরত সৈয়দ আবদুর রহমান সিদ্দিকী (রহ.)-এর বংশধর ছিলেন। ১৯১৯ সালে ৩৪ বছর বয়সে তিনি নিজ ফরজ হজ আদায় করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে দ্বিতীয়বার ‘আমিরুল হজ্ব’ হিসেবে হজ পালন করতে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা ও মদিনায় গমন করেন। পবিত্র আরব ভূমিতেও তিনি হজযাত্রীদের সেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বিশ্বব্যাপী বাঙালি আমিরুল হজ্ব হিসেবে বিশেষ পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেন। চট্টগ্রামের যেসব ক্ষণজন্মা কৃতী ব্যক্তিত্ব আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁদের আমরা নিজ নিজ অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে থাকিকেউ মূল্যায়িত হন স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের জন্য, আবার কেউবা শিল্পসাহিত্যে কৃতিত্বের জন্য।

কিন্তু খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী আজীবন চট্টগ্রামবাসীর স্বার্থ ও অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। অধিকার ও ন্যায্য দাবী আদায়ে তিনি ছিলেন আপসহীন ও দৃঢ়চেতা। তাঁর এই সংগ্রামী ও নীতিনিষ্ঠ ভূমিকার মধ্য দিয়ে তিনি বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রামের এক সুযোগ্য সন্তান হিসেবে স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেতা সময়ের বিচারে নির্ধারণ হবে।

আমিরুল হজ্ব খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক : অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরক্তের রেখা থেকে চেতনার আলো
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে