সৌদি আরবে নারী শ্রমিকের সম্ভ্রম ও আমাদের দায়বদ্ধতা

রোকসানা বন্যা | শনিবার , ৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

সৌদি আরবে বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের বিষয়টি আমাদের জাতীয় বিবেকের জন্য এক গভীর ক্ষত। এটি কেবল একটি শ্রমবাজারের সমস্যা নয়, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। দিনের পর দিন এই নারীরা বিদেশের মাটিতে যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছেন, তার সুরাহা হওয়া জরুরি।

প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশী নারী সচ্ছলতার আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু অনেকের জন্যই সেই মরুর দেশ শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। হাড়ভাঙা খাটুনির পর মাস শেষে বেতন পাওয়ার বদলে জোটে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীদের ওপর পাশবিক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীরা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হয়ে সন্তান কোলে নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু এই জঘন্য অপরাধের কোনো বিচার হচ্ছে না, বরং ভুক্তভোগীদেরই ভাগ্যে জুটছে লোকলজ্জা আর অবজ্ঞা।

সৌদি আরবের প্রচলিত ‘কাফালা’ প্রথা অনুযায়ী একজন কর্মী তার নিয়োগকর্তার মর্জির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া এবং গৃহবন্দী করে রাখায় নির্যাতিতা নারীরা কোথাও অভিযোগ করার সুযোগ পান না। ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হলে সৌদি আইনে অনেক সময় উল্টো নারীকেই ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।

ডিএনএ টেস্ট বা শক্ত প্রমাণের অভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী নাগরিকরা পার পেয়ে যায়, আর বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় আইনি সুরক্ষার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়। নির্যাতিতা নারীরা যখন পুলিশের দ্বারস্থ হন, ভাষাগত সমস্যার কারণে তারা নিজেদের যন্ত্রণার কথা ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারেন না। এছাড়া দূতাবাসের সেফ হোমগুলোতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিদেশের মাটিতে আমাদের মাবোনদের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কেবল শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ।

সমাধানের জন্য যা করা জরুরি

বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি সরকারের সাথে শ্রম চুক্তিতে নতুন শর্ত যুক্ত করতে হবে। কোনো কর্মী নির্যাতনের শিকার হলে তার দায়ভার সরাসরি সৌদি নিয়োগকারী সংস্থাকে নিতে হবে। প্রতিটি কর্মীর জন্য একটি জরুরি হেল্পলাইন এবং দ্রুত উদ্ধারকারী দল নিশ্চিত করতে হবে। এই মানবিক বিপর্যয় রুখতে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশের মাটিতে আমাদের মাবোনদের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কেবল শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ।

অভিযোগ ওঠা মাত্রই দ্রুত ডিএনএ টেস্ট ও ফরেনসিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে যেন অপরাধীকে শনাক্ত করা যায়।

প্রতিটি দূতাবাসে দক্ষ আইনজীবীদের সমন্বয়ে লিগ্যাল সেল গঠন করতে হবে যারা স্থানীয় আদালতে নির্যাতিতার পক্ষে লড়বে। স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে নারী কর্মীদের অবস্থান ট্র্যাক করা এবং জরুরি বিপদে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমগুলোর সংখ্যা এবং মান বাড়াতে হবে।

বিদেশে নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসা নারীরা যখন দেশে ফেরেন, তখন সমাজ তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো বাঁকা চোখে দেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। এই নারীরা গভীর মানসিক ট্রমা নিয়ে ফেরেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তাদের জন্য নিবিড় কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে।

এই নারীদের স্বাবলম্বী করতে বিনা সুদে ঋণ ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন।

আমরা যদি কেবল প্রবাসীদের পাঠানো ডলারে ভাগ বসাই কিন্তু তাদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারি, তবে সেই উন্নয়নের কোনো সার্থকতা নেই। রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিককে বিদেশে পাঠায়, তখন তার ইজ্জত ও প্রাণের দায়ভারও রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। সৌদি আরবের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশকে আরও কঠোর ও আপসহীন হতে হবে।

রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা এই নারী শ্রমিকরা আমাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। কিন্তু যোদ্ধার সম্মান তো দূরের কথা, তারা যদি ন্যূনতম মানুষের মর্যাদাটুকুও না পান, তবে সেই অর্থের কোনো সার্থকতা নেই। সময় এসেছে সৌদি আরবের সাথে টেবিল টকএ কঠোর হওয়ার এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার।

আর কোনো মাবোন যেন বিদেশের মাটিতে সম্ভ্রম হারিয়ে রিক্তহস্তে চোখের পানি নিয়ে দেশে না ফেরে। এই হোক আগামীর দাবি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রেখে সংবর্ধনার প্রয়োজন নেই
পরবর্তী নিবন্ধসাম্যের লড়াইয়ের মাশুল গুনতে হয় বেঁচে যাওয়া সৈনিকদের