
স্বাধীনতা যে কোনো জাতির সর্ব শ্রেষ্ঠ অর্জন। এ দেশের স্বাধীনতা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত। এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ–মুক্তিযুদ্ধ। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এ মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও বহু আত্মত্যাগের চূড়ান্ত পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। স্বাধীনতার চেয়ে আর বড় কিছু থাকতে পারে না। একটা জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতার জন্য যে যুদ্ধ তা মুক্তিযুদ্ধ। এজন্য মুক্তিযুদ্ধ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এ যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানী সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর সাথে নিরস্ত্র বাঙালির যুদ্ধ। মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতার সাথে অকুতোভয় সৈনিকের মতো দীর্ঘ নয় মাস পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর প্রেক্ষাপট অনেক আগে থেকে তৈরি হতে থাকে। এর জন্য জাতিকে প্রস্তুত করে তুলতে হয়। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস যোগাতে হয়। শাসন শোষণ বঞ্চনা আর বৈষম্যের বেড়াজাল চিহ্ন করার জন্য দুঃসাহসের প্রয়োজন হয়। জেল জুলুম নির্যাতনের পরোয়া না করে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে হয়। এর জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া জাতি কখনো ঐক্যবদ্ধ হয় না। স্বাধীনতা নেতৃত্ব ছাড়া আসে না। মুক্তিযুদ্ধও নেতৃত্ব ছাড়া সংঘটিত হয়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়, মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দেশে দেশে যেখানে স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছে সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বে শুরু হয়েছে। অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নেতৃত্ব দিয়েছে।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। জাতি অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে সোচ্চার হতে থাকে। আত্মপরিচয়ে বলিয়ান হয়। আত্ম নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবতে পারে। দাবী আদায়ের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ অনুধাবন করে। এর প্রতিফলন ঘটে চুয়ান্নের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে। এ নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষেরা তাদের চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। অধিকার আদায়ের আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে ধাবিত হয়।
এক্ষেত্রে মধ্য পন্থার ও বাম রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যেও কোনো কোনো দল এ ধারার সাথে যুক্ত হয়। পুরাপুরি ডানপন্থী বা পুরাপুরি বামপন্থীর চেয়ে ডান ও বামের সমন্বয়ে গঠিত মধ্য পন্থার ধারাটা বিকশিত হতে থাকে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন এ ধারার প্রতি ঝুকে পড়ে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়ে মধ্যবিত্তরা নিজেদের বলয় গড়ে তোলে। এদের সাথে যুক্ত হয় নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরাও ধীরে ধীরে যোগ দিতে থাকে। এসব দল থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বও গড়ে উঠে। তারা দলের বিভিন্ন কর্মসূচি জনগণের কাছে তুলে ধরে। দাবী আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রামের পথ ধরে এগিয়ে চলে। জনগণ এসব কর্মসূচিতে সাড়া দেয়। দিনে দিনে জনসম্পৃক্ততা বেড়ে চলে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থক এতো বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায় এসব দল জনগণের দলে পরিণত হয়। দলের নেতারাও জনগণের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজনৈতিক নেতার মধ্যে মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদেশের ছাত্র সমাজ ও সাধারণ মানুষ তাদেরকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারাও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তবে এ দুই জন তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য জননেতায় পরিণত হয়। একজনকে মজলুম জননেতা বলা হয় আরেকজনকে বঙ্গবন্ধু বলে সম্বোধন করা হয়। রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের ডাক দিয়ে জনগণকে জাগিয়ে তোলে।
ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়। আইয়ুব বিরোধি আন্দোলনে পূর্ববাংলার জনগণ রাজপথে নেমে আসে। এ আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রণী।
সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নিরংকুশ সংখ্যাঘরিষ্ঠতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিনত হয়। কিন্তু পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা টালবাহানা শুরু করে। এতে পূর্ব বাংলার মানুষ আবার আক্রোশে ফেটে পড়ে। একাত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারিতে মানুষ যে রাস্তায় নেমে আসে আর ঘরে ফিরে যায়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করা হয়। মার্চের শুরুতে চারিদিক উত্তাল হয়ে ওঠে। শহরে বন্দরে গ্রামে গঞ্জে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মিছিল বিক্ষোভ শুধু বড় বড় রাস্তায় নয়, শহরের অলিগলিতে পাড়া মহল্লায় চলতে থাকে। গ্রামের হাট বাজারে স্কুলের মাঠে প্রতিদিন মানুষ জমায়েত হতে থাকে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ মিছিল করে শ্লোগান দেয়। উত্তাল এ সময়ে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিনের জনসভায় উপস্থিত থাকে। পরের দিন রেডিওতে কোটি কোটি মানুষ তাঁর এ ভাষণ শোনে। তিনি বজ্রকণ্ঠে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকো, শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম’। এরপরে থেকে মানুষ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।
পঁচিশে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরহ মানুষের ওপর বর্বর আক্রমণ চালালে বাঙালি রুখে দাঁড়ায়। ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সাতাশে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা শুধু দেশে নয় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইপিআর ও বাঙালি সেনা সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ করতে থাকে। মুক্তিপাগল মানুষকে আর আটকে রাখতে পারে না। মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। সকল শ্রেণি পেশার মানুষ এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। ছাত্র তরুণ কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের অংশ গ্রহণে মুক্তিযোদ্ধারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে মুক্তিযুদ্ধ পরিণত হয় জনযুদ্ধে। পূর্ব বাংলার এমন কোনো গ্রাম বা জনপদ নেই যেখানে হানাদার বাহিনী বা তাদের দোসররা আক্রমণ করেনি। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে টিকে থাকতে পারেনি। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজয় বরণ করতে হয়। ষোলই ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রু মুক্ত হয়। বাঙালি বিজয় অর্জন করে। বাংলার আকাশে লাল সবুজের পাতাকা উড়তে থাকে। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গৌরবোজ্জ্বল স্থান করে নেয়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী।











