১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাপ্ত হলো। সুষ্ঠু নির্বাচনের ভেতর দিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। নতুন সরকারের প্রথম প্রধান উদ্দেশ্য হলো যে, মূল্যস্ফীতি হ্রাস করে এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে ক্রমবর্ধমান হারে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া, যেখানে মানুষ তথা জনগণ থাকবে শান্তিতে। এ দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আশা হচ্ছে, পরিবারের বেড়ে উঠা সন্তানটি যথাসময়ে চাকুরি পাবে। পরিবারের আয় বৃদ্ধি পাবে। পণ্যমূল্য ক্রমাগত হ্রাস পাবে। পরিবারটির চোখে থাকবে রঙিন স্বপ্ন, যেখানে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি অবস্থান করছে। পারবে কী বর্তমান সরকার এই বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে? প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বপ্নে ভাবা সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি তখনই বাস্তবায়ন হয় যখন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, পণ্যমূল্য স্থিতিশীল থাকে বা হ্রাস পায়। দেশে চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী, মব সংস্কৃতি হ্রাস পেলে সমাজে সুখ ও শান্তি আসে। আর সমৃদ্ধির ব্যাপারটি একটি জটিল সমীকরণের ব্যাপার। অর্থনীতির এ জটিল সমীকরণে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে দুইটি স্তরে ভাগ করা হয়। এদের একটি হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর অপরটি হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সাধারণত রাজনৈতিক নেতারা মাঠে ময়দানে বক্তব্য দেয়ার সময় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এর কথাটি বলে থাকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথাটি বলে না। হয়তো এমনও দেখা যাবে অনেক রাজনীতিবিদদের এ সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা নেই। প্রকৃতপক্ষে একটি অর্থনীতিতে বেশ কয়েকটি খাত (Sector) আছে। যেমন– শিক্ষা খাত, সেবাখাত, শিল্পখাত ইত্যাদি। আবার প্রতিটি দেশে খাতের পরিমাণ সমান নয়। বাংলাদেশের বর্তমানে এরূপ ১৯টি খাত রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), জিডিপি (Gross Domestic Product) গণনার সুবিধার্থে অর্থনীতিকে ১৫টি প্রধান খাতে এবং পরবর্তীতে ২০১৫–১৬ অর্থবছরের ভিত্তি বছর অনুযায়ী ১৯টি খাতে বিভক্ত করেছে। এ ১৯টি খাতের উন্নতি যদি দেখা যায়, এবং তা যদি ক্রমবর্ধমান হয় তবে বলা যায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) হয়েছে। আর যদি খাত ভিত্তি উন্নতি দেখা যায় তবে বলা হয়ে থাকে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Economic Development) হয়েছে। কাজেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়টি খুবই জটিল।
অতএব নতুন সরকারকে সাফল্য লাভ করতে হলে এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। শুধু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই এসব সমস্যা সমাধান হবে না। সরকার পেয়েছে একটি দুর্বল ও চাপে থাকা অর্থনীতি। যেখানে ছিল নীতিগত উদাসীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। নষ্ট হয়েছে শৃঙ্খলা আর এ শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার কারণে প্রতিটি সেক্টরে বেড়ে গেছে ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজী। এ ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমেছে অর্থনৈতিক গতি, কমেছে প্রবৃদ্ধি এবং আরো কমেছে শৃঙ্খলা। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ ক্রমাগত সংকট বেড়েছে। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে হয়ে গেছে ভঙ্গুর। ঋণ খেলাপি দিনে দিনে বেড়ে গেছে। এদেশের আপামর জনগণ আশা করেছিল অন্ততঃ অভ্যুত্থান পরবর্তী ঋণ খেলাপি কমবে বা স্থির থাকবে। ব্যাংক তথ্য থেকে পাওয়া যায়, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান পরবর্তী ঋণ খেলাপি আরো বেড়েছে। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী যা ছিল পরবর্তীতে অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ ও অপচয়মুখী হয়েছে। সরকারি ঋণ ক্রমাগত বেড়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ও বেড়েছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের সেই বিখ্যাত কবিতার উক্তিটি মনে করিয়ে দেয় যে, ‘দিনে দিনে শুধু বাড়িতেছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’। এ কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিমাণও কমেছে। এ অবস্থায় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি হয়েছে।
এ নিষ্ঠুর বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে নতুন সরকার। নতুন সরকারকে প্রথমে সুশাসন জোরদার করতে হবে। অন্তত মব সংস্কৃতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। তবে দেশের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন ও দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মনে রাখতে হবে– এ তিনটি বিষয় একটির সাথে অপরটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রথমত, বিনিয়োগ বৃদ্ধি। একটি দেশ সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি দ্বারা এককভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে পারে না। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ অতীব প্রয়োজন। বিনিয়োগ বৃদ্ধিদ্বারা উৎপাদনশীলতা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি কর্মসংস্থান ও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত অর্জিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিগত সরকার বেসরকারি বিনিয়োগকে মোটেই আকৃষ্ট করতে পারেনি। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মান ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ও তুলনামূলক কম। নীতিগত অনিশ্চিয়তা, জটিল নিয়মকানুন, চুক্তি বাস্তবায়নে জটিলতা এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের আস্থা চরমভাবে হ্রাস করেছে। পূর্বের ব্যাংক ব্যবস্থায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং বার বার ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে ঋণ ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। এরূপও হয়েছে, ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পায় না, অথচ প্রভাবশালীরা সহজে ঋণ পায়। অতএব ব্যাংক খাতের সুশাসন জোরদার করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে হবে। কর ব্যবস্থা সহজ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধা দেয়। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরো দরিদ্রতম পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমাজে বৈষম্যকে প্রকট করে তোলে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিগত বছরগুলোতে প্রায়ই দশ শতাংশ মূল্যস্ফীতি লেগেই ছিল। কোনো কোনো সময় এ মূল্যস্ফীতি দশ শতাংশ থেকে আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মাত্র দেড় বছরে আরো ত্রিশ লাখ লোক নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে দারিদ্র্য সীমার নীচে নেমে গিয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মূল্যস্ফীতি যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে মজুরি হার সে হারে বাড়েনি। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। একই সাথে সঞ্চয়ও কমেছে। মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্ঠিতে খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি যায় খাদ্যে। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবন যাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশ্য মূল্যস্ফীতির জন্য বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা ও অনেকাংশে দায়ী। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি খরচে বেড়ে যায়। আবার বহির্বিশ্বের জ্বালানী বাজার এর ওপর নির্ভর করে পণ্যমূল্যের দাম। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের দাম যদি বৃদ্ধি পায় তবে বিশ্ব বাজারে খাদ্যের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ে তেমনি পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিটি খাতে এর চাপ পড়ে। বিশেষ করে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পায় এবং তা সরাসরি হিট করে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির ওপর। আবার দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি। এসব বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে কৃষি খাতে জ্বালানী তেলের ভর্তুকির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন সরকারকে গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। বাংলাদেশ নামক এই ছোট্ট আমাদের দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রম বাজারে প্রবেশ করে। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মে নিয়োজিত করার মত ব্যবস্থা বর্তমানে নেই। যা ছিল তা বরং ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে। শুধুমাত্র সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ভেতর দিয়ে প্রতিবছর এই বিপুল পরিমাণ তরুণ সমাজকে কর্মে নিয়োজিত করা প্রায় অসম্ভব। এ জন্য সরকারকে দ্রুততার সাথে বিদেশি বিনিয়োগ যাতে সহজ হয় তার জন্য বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। অবশ্য দুঃখজনক হলো যে, বিগত শতকের আশির দশক থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার বিভিন্ন পদক্ষেপ বিভিন্ন সরকার গ্রহণ করেছে এমন সংবাদ পত্র পত্রিকায় দেখা গেছে। কিন্তু আজ পঁয়ত্রিশ বছর পরেও একই কথা বলতে হচ্ছে। অতএব লোক দেখানো নিয়ম–কানুন নয়। বরং দেশকে ভালবেসে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। তবেই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। মোট কথা সরকারকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সর্বোপরি ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এখনই থামাতে হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ,
গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।












