আজ ১৭ মার্চ, জাতীয় শিশু দিবস। এই দিনটিকে উপলক্ষ করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো অ্যাপোলো ইমপেরিয়াল হসপিটালস ও বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে – শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, শিশু স্বাস্থ্য সচেতনতায় র্যালি, শিশু বিকাশ ও শিশুদের যত্ন, শহরের শিশুদের পুষ্টি বিষয়ক সমস্যা ও তার প্রতিকার, অভিভাবকদের করণীয় বিষয়ক সমস্যা সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর ও পরামর্শ প্রদান। বিশেষ দিনটিকে একটি বিষয়ের উপর কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। আর সেটা হলো শিশুর বিকাশ। বিশেষ করে শিশুদের দেরিতে কথা বলার কারণ ও প্রতিকার।
১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। যার মধ্যে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ শিশু, যা জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। সবসময় শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে যখন কথা আসে, তখন শুধু তাদের শারীরিক সমস্যার কথাই হয়। শিশুরা কি শুধুমাত্র শারীরিক অসুস্থতায় ভোগে ? নাকি তাদেরও মানসিক বিকাশ জনিত সমস্যা, পুষ্টির অভাবও হতে পারে ?
গত দু–তিন বছর আমরা কোভিড পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ পরিস্থিতি, খাদ্য সংকট ইত্যাদি নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে পার করেছি, এখনও করছি। এর প্রভাব শিশুদের উপরেও পড়েছে। যেমন ধরুন কোভিডের সময় শিশুরা ঘর থেকে বের হতে পারেনি। শিশুদের ব্যস্ত রাখার জন্য বাবা–মায়েরা তাদের হাতে স্মার্ট ফোন, স্মার্ট টিভি, নানা রকমের গ্যাজেট তুলে দিয়েছেন, পরিণামে তারা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
মোবাইল ফোনের ক্ষতিকারক দিকগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে।
শিশুর জন্মের পর থেকে প্রথম ১ বছর তাদের কথা বলার ভাব প্রকাশের ভিত তৈরি হয়, এই সময়টাতে যখন তাদের হাতে মোবাইল দেওয়া হয়, তার প্রভাবটা কেন ক্ষতিকারক হয় ? একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাঁচ বছরের নিচে শিশু ৩০ মিনিটের বেশি মোবাইল ফোন বা গ্যাজেট ব্যবহার করলে তার ব্রেইনের নিউরনগুলো আড়াই ঘন্টা অস্বাভাবিক আচরণ করে ফেলে। বাচ্চারা অস্থিরতায় ভোগে, মনোযোগ নষ্ট হতে চায়, অসামাজিক হয়ে পড়ে। দেখা গেছে শহরের প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ৩০০ জন শিশু ভাষাগত সমস্যায় ভোগে। যেখানে গ্রামে এই সংখা্য প্রতি ১০ হাজারে মাত্র ৬ জন।
অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের ব্যবহারে শিশুরা নিজেদের মধ্যে ভাষায় প্রকাশের মাধ্যমে যোগাযোগটা করিয়ে দেয়। কথা বলার সময় তার শব্দ খুঁজে পায় না। অতিরিক্ত গ্যাজেটের ব্যবহার শিশুদের স্বাভাবিক ঘুমে ব্যঘাত ঘটায়। অথচ বুদ্ধিমত্তা প্রকাশের প্রথম ও প্রধান শর্ত এই ঘুম। প্রতি এক ঘন্টা মোবাইলের ব্যবহার ১৬ মিনিট ঘুম কমিয়ে দেয়।
মোবাইল ব্যবহার যে অস্থিরতা তৈরি করে তার প্রভাব পরবর্তী জীবন, যেমন তার শিক্ষা জীবন, কর্ম জীবন, পারিবারিক জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলে, অল্পতেই রেগে যায়, কোন গঠনমূলক কাজ সঠিকভাবে শেষ করতে পারে না, এই শিশুরা সাধারণত চোখে চোখে তাকিয়ে কথা বলে না। অনেকটাই অসামাজিকভাবে বেড়ে ওঠে। অনেক সময় এদের আচরণে মানুষ ভুল বোঝে।
মোবাইল শুধু বুদ্ধি বিকাশ কে ব্যহত করে না, শারীরিক স্বাস্থ্যকেও ব্যহত করে, এই শিশুরা স্থুলতায় ভোগে। সংক্ষেপে আমরা এটাই বলতে পারি, প্রথম দুই বছরে অতিরিক্ত মোবাইল বা গ্যাজেট ব্যবহারের ফলে বাচ্চারা দেরিতে কথা বলে, কখনও কখনও কথাই বলে না, আর যদিও বা কিছু বলে, তা এমনভাবে বলে যা বোঝা যায় না।
আজকাল মায়েদের কাছ থেকে আর একটি কথা খুব শোনা যায়, তা হলো মোবাইল ছাড়া বাচ্চাদের খাবার খাওয়ানো যায় না, যার ফলে শিশুরা কি খাচ্ছে, খাবারের কি গন্ধ কিংবা রং কি কিছুই বুঝতে পারে না, ফলে তাদের খাবারের রুটি তৈরি হচ্ছে না, তারা জানেই না তারা কি খাচ্ছে ?
এর প্রতিকার কি ?
এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারেন মা–বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। মা–বাবা যখন বাসায় থাকেন, তখন তাদেরকে নিজেদের মোবাইল বা গ্যাজেট ব্যবহারে সংযত হতে হবে। একজন শিশু তার মা–বাবা অনুসরণ করে সবচেয়ে বেশি। শহরের মা–বাবারা অনেকেই চাকরি করেন, বাসায় যেটুকু সময় থাকেন, সেটুকু সময় শিশুদের সাথে বেশি বেশি কথা বলবেন, গল্প করবেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। এটাই হওয়া উচিত। বাসার ছোট–খাটো কাজের সাথে সংযুক্ত করা উচিত। নানা রকম সৃজনশীল কাজের সাথে সংযুক্ত করা যায়, যেমন– ছবির বই দেখিয়ে বিভিন্ন রকমের পশু–পাখি, ফুল, গাছ–পালার সাথে পরিচিতি করানো। ছোট–ছোট ধাঁধাঁর (পাজল) সমাধান করানো, ছড়া বলা শেখানো আজকাল বেশির ভাগই ফ্ল্যাট বাড়িতেই আমাদের বসবাস, সেই ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদের সাথে একটা যোগাযোগের মাধ্যম তৈরি করা উচিত। যেমন–বাচ্চাদের আলাদা খেলার জায়গা করা, যেখানে তারা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করার সুযোগ পাবে। বিভিন্ন রকম খেলাধুলার মাধ্যমে শারীরিক চর্চার সাথে সাথে একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। সপ্তাহে অন্তত: একদিন খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া, যেখানে শিশুরা প্রকৃতির সাথে মিশতে পারবে।
প্রতিকার :
শিশুকে বৃদ্ধি ও বিকাশ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ এর মাধ্যমে Early Childhood Development Initiative নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যার মাধ্যমে প্রাক–প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করছে। যেখানে শিশুর বিভিন্ন রকম বিকাশজনিত সমস্যা চিহ্নিত করার মাধ্যমে এর প্রতিকার এবং পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন–বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাঊন্ডেশন শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে এর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অ্যাপোলো ইমপেরিয়াল হসপিটালস ও শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যথেষ্ট এবং এরা CDC (Child Development Centre) এর মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।
লেখক : সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, শিশু ও নবজাতক বিভাগ, অ্যাপোলো ইমপেরিয়াল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম












