ভূতের মুখে অসহনীয় রাম রাম জপ

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী | শনিবার , ৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৫:২০ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ববাসী সম্যক অবগত আছেন; অতিসম্প্রতি বড় দিনের বার্তায় ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের ভ্যাটিকানে বার্ষিক বক্তব্যে সুপ্রতিষ্ঠিত যে ‘বিশ্ব শান্তির দুর্ভিক্ষে ভুগছে’। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিশেষ করে খাদ্য দ্রব্যকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে নির্দয় ব্যবহার বিশ্বকে লন্ডভন্ড করার নিগূঢ় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধ সংকটের প্রবলতাকে অধিকতর বেগবান এবং কঠিন অন্ধকারের দিকে নিপতিত করছে। বিশ্বের ৩০ শতাংশ গম রপ্তানি হয় ইউক্রেন থেকে। যুদ্ধের কারণে শস্যের দামের চড়া উল্লস্ফন গম নির্ভর জাতিগোষ্ঠীকে চরম বিপাকে বিপর্যস্ত করছে। কথিত আধুনিক ক্ষমতাধর উন্নত শক্তিসমূহ উন্নয়নমানবাধিকারের ফেরিওয়ালা রূপে অযাচিত আর্বিভূত হয়েছে। এসব অশুভ শক্তির সম্মিলিত অপচেষ্টা উন্নয়নশীলঅনুন্নত দেশসমূহে নানামুখী ঘৃণ্য চাপ প্রয়োগ ও অনভিপ্রেত চক্রান্তে অরাজক রাজনৈতিকসামাজিক পরিস্থিতি সৃষ্টির কুৎসিত অপতৎপরতায় লিপ্ত। অনুন্নয়নের উন্নয়নকে টেকসই করে এরা বৈষম্যের আচ্ছাদনে শোষণ প্রক্রিয়ায় নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকে সবল রাখার প্রচলিত দৃষ্টান্ত অব্যাহত রেখেছে। বিষয়টি গতানুগতিক হলেও সাম্প্রতিক সময়ের প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদেরকেও কঠোর পর্যুদস্ত করছে। ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না’ নিখাঁদ এই চিরন্তন বিধান সকলেরই হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হলে এই ধরিত্রী অধিকতর দুর্ভোগ মুক্ত থাকবে দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস প্রকাশ কোনভাবেই অমূলক নয়।

অতিসম্প্রতি প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবী অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক প্রতি বছর গড়ে এক হাজারের অধিক মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছে। একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের উদ্যোগে ২০২১ সালের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ‘দ্য লেনসেট’ উল্লেখ করেছে, প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুনেরও বেশী হতে পারে। কারণ অধিকাংশ সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের অপকর্মের তথ্য নথিভুক্ত করতে অনিহা প্রকাশ করে। ক্ষেত্র বিশেষে চোখ রাঙানির কারণে ভিকটিমের স্বজনেরাও এমন হত্যাযজ্ঞ নিয়ে মাথা ঘামানোর সাহস করে না। ‘স্ট্যাটিস্তা গবেষণা দফতর’ এর পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে আমেরিকানদের প্রাণ সংহারের সংখ্যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। উক্ত পরিসংখ্যান মতে ২০২১, ২০২০, ২০১৯, ২০১৮ ও ২০১৭ সালে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে যথাক্রমে ১০৫৫, ১০২০, ৯৯৯, ৯৮৩ ও ৯৮১ জন। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের তথ্যানুসারে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কর্তৃক বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় ৩ হাজার ৭৫টি।

যুক্তরাষ্ট্রে বিগত কয়েক বছরজুড়ে বন্দুক সহিংসতায় প্রাণহানি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দেশটিতে বন্দুক সহিংসতার হার অন্যান্য দেশে বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র’র (সিডিসি) পরিসংখ্যান অনুসারে, অন্য যে কোন বছরের তুলনায় ২০২০ সালে বন্দুক হামলা সম্পর্কিত ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে গুলি করে হত্যার রেকর্ড সংখ্যক ঘটনার পাশাপাশি বন্দুক নিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত। উক্ত বছরে দেশটিতে বন্দুক সংক্রান্ত মৃত্যুর ৫৪ শতাংশ ছিল আত্মহত্যা এবং ৪৩ শতাংশ ছিল হত্যা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার এর জরিপ মতে ঐ বছর দেশটিতে এ ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৪৫ হাজার ২২২ জন যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ, বিগত ৫ বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ এবং এক দশকের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। এ ছাড়াও বন্দুকে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ৫৩৫, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন মৃত্যু ৬১১ এবং অনির্ধারিত পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছে চার শতাধিক। ২০১৬ সালের গবেষণা প্রতিবেদন মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ঐ বছর প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে বন্দুক সহিংসতায় মৃত্যুহার ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনে এ হার প্রতিলাখে যথাক্রমে ২ দশমিক ১ শতাংশ, ১ শতাংশ, ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ০ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু সহিংসতার এ হারে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে সালভাদর, ভেনেজুয়েলা, গুয়াতেমালা, কলম্বিয়া এবং হন্ডুরাজ। সামগ্রিকভাবে ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে বন্দুক সহিংসতায় মৃত্যুহারে যুক্তরাষ্ট্র ছিল ২০ তম স্থানে। সর্বশেষ গত ২৪ মে ২০২২ সালভাদর রামোস নামের এক তরুণ তার ১৮তম জন্মদিনে উপহার পাওয়া আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে একে একে হত্যা করে ১৯ শিশু আর ২ জন শিক্ষককে। ফলশ্রতিতে আরো একটি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে পুনরায় রক্তাক্ত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাঙ্গন।

সমসাময়িক সময়ে দেশে ও বিদেশে সর্বত্রই গুম নিয়ে নানা আলোচনাসমালোচনা নিরন্তর প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশের গুমের ঘটনা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের নিকট তথাকথিত নিখোঁজ হওয়া ৮৬ জন ব্যক্তির তালিকা পাঠিয়ে তাদের ব্যাপারে খোঁজ চেয়েছে। বিষয়টি যখন আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মিসিং এন্ড আনআইডেন্টিফায়েড পারসনস এর তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালেই নিখোঁজ হয়েছে ছয় লাখ মানুষ। সমসূত্র মতে উল্লেখ্য সময়ে ৪ হাজার ৪০০ বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে যাদের কোন পরিচয় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলসহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থার তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে বাংলাদেশে মাত্র ৩ ব্যক্তি অপহরণের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজের সংখ্যা ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯৮ জন। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের অর্থায়নে প্রস্তুতকৃত এই তথ্যভান্ডার পর্যালোচনায় দেখা যায় দশটি রাজ্যে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় ২ হাজার ১৩৩, ফ্লোরিডায় ১ হাজার ২৫২, টেঙাসে ১ হাজার ২৪৬, অ্যারিজোনায় ৯১৫, ওয়াশিংটনে ৬৪৩, নিউইয়র্কে ৬০৬, মিশিগানে ৫৫৬, ওরিগানোতে ৪৩২, পেনিসিলভ্যানিয়াতে ৪০১ এবং টেনেসিতে ৩৬১ জন। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও নিখোঁজের বিপুল ঘটনা ঘটছে। নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশে গুম হিসেবে বিবেচনার বিপরীতে খোদ তাদের দেশে এটিকে নিখোঁজ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

মার্কিন ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যুদ্ধের মূল্য’ শীর্ষক গবেষণা থেকে জানা যায়, ৪৭ হাজার বেসামরিক মানুষসহ আফগান যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৪ হাজার। বিশ্বের পরিসংখ্যান ডাটাবেস সূত্র বিশ্লেষণে, ২০০৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইরাকে যুদ্ধ ও সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৯০ হাজার। এছাড়াও শরণার্থীগ্রহহীন ইরাকির সংখ্যা প্রায় ৯২ লাখ। সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে অন্তত ৩ দশমিক ৫ লাখ মানুষের প্রাণ সংহার ও ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানব সন্তান গৃহহীন হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর ২০২২ গণমাধ্যম সূত্রমতে, চীনে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘মানবাধিকার ও গণতন্ত্র’ নামে এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। চীন সরকার তা প্রত্যাখান করলেও প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায় চীনে ২০২১ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি অবনতির পাশাপাশি গণমাধ্যমবাকধর্মের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনসমকামীতালিঙ্গ অধিকারের উপর ব্যাপক বিধিনিষেধ সুশীল সমাজের স্বাধীন অধিকার প্রয়োগে বাধাগ্রস্ত করেছে। উইঘুর মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ‘রাজনৈতিক পুনর্শিক্ষা শিবিরে’ বিচারবহির্ভূত আটক রেখে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশ্বস্বীকৃত। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোভিড১৯ মোকাবিলাসহ নানামুখী নজরদারিপর্যবেক্ষণ মহল বিশেষের মতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

মুক্তির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিপুল রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন প্রিয় মাতৃভূমির বর্তমান সরকার প্রধান হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। স্বপ্নের পদ্মাসেতুবঙ্গবন্ধু টানেলআধুনিক সহজ যোগাযোগ মাধ্যম মেট্টোরেলসহ জনগণের সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে নবদিগন্তের মাইলফলক প্রতিষ্ঠা করে চলছেন। আত্মবিশ্বাসের প্রকৃষ্ট প্রচেতায় দৃঢ়চেতা নির্ভীক সাহসিকতায় কথিত ক্ষতমাধরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি সুস্পষ্ট করেছেন; বাঙালি জাতিরাষ্ট্র যুদ্ধ চাই না, স্যাংশন চাই না, বিশ্বময় শান্তি চাই। সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় গণতান্ত্রিকঅসাম্প্রদায়িকমানবিক অনুষঙ্গে নতুন পৃথিবীর অনুসন্ধান বস্তুত অনিবার্য হয়ে পড়েছে। ধর্মবর্ণজাতিঅঞ্চল নির্বিশেষে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলপত্রে মনুষ্যত্বমানবতার জয়গানে মুখরিত হোক সমগ্র পৃথিবী। মিথ্যাঅযৌক্তিক অজুহাতে কোন দেশকে নিপীড়ননির্যাতন না করে বাংলাদেশসহ পুরোবিশ্বে দুর্ভিক্ষসহ সম্ভাব্য জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রচন্ড অনুপ্রেরণাচ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদাত্ত আহ্বান এই গ্রহের সকল নাগরিকবৃন্দের জন্য অতিশয় উজ্জীবিত চেতনার দ্বার উম্মোচন করবে নিঃসঙ্কোচে এই আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্ববর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে
পরবর্তী নিবন্ধবোয়ালখালীতে ইসলামী ফ্রন্টের মতবিনিময়