একটি ধ্রুবতারা যার আরেক নাম ‘মুশতারী শফী’

রুমানা শফী | মঙ্গলবার , ২০ ডিসেম্বর, ২০২২ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ


ক্ষণ পাল্টায়, দিন পাল্টায়, জীবন জগতের রকমফের পাল্টায়, যুদ্ধের ধরন পাল্টায়। সব পাল্টে নতুন যুদ্ধ… আমাদের বাবা- মা বিহীন মনের সাথে এক অন্য রকমের যুদ্ধ। গতবছরও তুমি সাথে ছিলে মা, তুমি চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে জীবনের শেষ যুদ্ধে রত আর আমরা তোমায় ঘিরে তোমার পাশে পাশে তোমার সুস্থতার চেষ্টায় অবিরত।

হ্যাঁ, তুমি শেষ বিজয় দিবসের স্বাদ আস্বাদনের জন্যেই যেন অপেক্ষমাণ ছিলে! তোমার মেজো মেয়ে নাসরিন চোখে মুক্তোর অশ্রু ধারায় কপালে লাল টিপ পড়ে তোমাকে বলেছে, আজ বিজয় দিবস মা, তোমার কতো কাজ.. কতো মিটিং.. কতো অনুষ্ঠানে যাবার কথা! তুমি যাবে না? এই বিজয় তুমি এনেছো। আব্বা এনেছে…. তুমি কিছু বলবে না?

অস্ফুট স্বরে তুমি বলে উঠেছিলে ‘ব ঙ্গ ব ন্ধু’

ওহ্‌…. অঝোর ধারায় কান্নাকে দমিয়ে রাখতে পারলো না, কিন্তু মুখে যন্ত্রণা মেশানো হাসি নিয়ে তোমাকে পরখ করে দেখেছিল সে, তোমার দু-চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি ঠিক দু’কানের কাছে। মুছিয়ে দিলো, চুমু খেলো, অনেক অনেক আদর করতে করতে ডুকরে উঠলো।

মনে হলো, তুমি ভাবছো ৭ মার্চের জাতির শ্রেষ্ঠ বাঙালির শ্রেষ্ঠতম কাব্যের কথা, কবিতার কথা!

আচ্ছা মা, তুমি কি তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ন’মাসের বিভিন্ন ঘটনার ভিতর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিলে! তোমার ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের নিয়ে শরণার্থী জীবন! তোমার শিশু শরণার্থীরা দু’দিন না খেয়েছিলো, মুখে একটু গুড় দিয়ে পানি খাইয়ে বলেছিলে এখন ঘুমাও, ঘুম ভাঙলেই খাবার আসবে। আহা কতো রকমের দিন কাটিয়েছি, শুধু এক নেতার ডাকে, যিনি তোমাকে বান্ধবী বলে ডাকতেন। মা তুমি কি বঙ্গবন্ধুকেই ভাবছিলে?

হঠাৎ পেছন থেকে তাড়া দিলো সিস্টার। আপনাদের আরও তো অনেকে দাঁড়ানো বাইরে। আরও একটু আদর… তারপর ছুটে বেরিয়ে আসা, যে আসা ছিলো পৃথিবীর সব চাইতে কষ্টের।

তারপর! তারপর একে একে সবাই. আমিও… লাল সবুজের শাড়ি পরে, কপালে টিপ সাথে এলো খোঁপা। সব বোনেরা তাই পড়েছি আম্মাকে বোঝাতে আজ বিজয় দিবস। তোমারই পছন্দের সাজে তোমার মেয়েরা।

বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তির আনন্দের ফল্গুধারার ঝলকানি সারা দেশজুড়ে আর তুমি! তোমার আনা বিজয়ের স্বাদ বোঝাতে আমরা সচেষ্ট। তোমাকে বোঝাতে বিজয়ের পঞ্চাশ বছর, তোমাকে বোঝাতে বাবা নেই আজ পঞ্চাশ বছর, তুমি বুঝলে কিনা এই জাতির জন্যে পঞ্চাশ বছর অগণিত, পাহাড় সম কাজ তুমি করে গেছো! এটুকুই তুমি বোঝ মা আজ বিজয়ের পঞ্চাশ বছর, আর কিচ্ছু না- আর কিচ্ছু না, ভীষণ ক্লান্ত তুমি আজ।

দেশ মুক্ত করবার যুদ্ধে, জীবন জীবিকার যুদ্ধে, সাতজন সন্তান মানুষ করবার যুদ্ধে, নারী স্বাধীকারের যুদ্ধে, ঘাতকদের নির্মূল করবার যুদ্ধে, অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার যুদ্ধে, চট্টগ্রামের নারী যোদ্ধাদের স্বীকৃতির জন্যে তথ্য নির্ভর লেখনীর যুদ্ধে, শিশুদের বিকশিত করবার যুদ্ধে, হাসপাতালে অসহায় মানুষের সহায় হবার যুদ্ধে, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির যুদ্ধে…। তুমি কী দিয়ে তৈরি জানি না মা, প্রতিটা যুদ্ধে তুমি একজন জয়ী যোদ্ধা, একজন কিংবদন্তি নারী, একজন আলোকবর্তিকা, একজন হার না মানা নারী। আজও তুমি জীবনের শেষ যুদ্ধে হার না মানা নারী। যে নারী লিখে রাখে তাঁর কাঁপা হাতে জাতির জন্যে শেষ শপথ!
আমি সত্যিই শিহরিত হই…তুমি আমার মা! পুরুষ বলো নারী বলো পৃথিবীতে তোমার মতো মানুষ আমি দেখিনি। এই মানুষটা তাঁর নিজের ইচ্ছায় চেষ্টায় সমাজের আজ বলিষ্ঠ সম্পদ।

দেখলাম আমার সূর্য লাল টিপ তোমার চোখে মুখে বিজয়ের শেষ সূর্যের রক্তিম আলো ছড়াচ্ছে। তুমি সত্যিই দিনটির জন্যে অপেক্ষমাণ ছিলে। খুব ভালো করে তুমি তাকিয়ে থাকলে সূর্য লাল টিপের দিকে, আমার দিকে। মনে হলো এক সময় তুমি একটা প্রশান্তির শ্বাস ছাড়লে। আদর করলাম বুক ভরে। তুমিও হাত উঁচু করে আমার দিকে এগিয়ে দিলে, কেন বুঝিনি মা, মনে হলো তুমি আদর করতে হাত উঠালে, সাথে সাথে নিজের মুখটা তোমার হাতের স্পর্শে গলিয়ে দিলাম, যে আদরের স্পর্শে আমি হারিয়ে যাই ক্ষণে ক্ষণে এখনো।

তারপরের দুদিন তুমি ছিলে ভীষণ ব্যস্ত। পৃথিবীর তাবৎ না বলা কথা তুমি বলে যাচ্ছো আমাদের সবাইকে, কিন্তু হায়! কিচ্ছু আমরা বুঝতে পারিনি… তবে হ্যাঁ, তুমি স্পষ্ট ভাবে সমীরকে খুঁজেছিলে, আমি দরজার ফাঁকা দিয়ে তাকিয়েই ছিলাম। তুমি সমীরকে যেন অসমাপ্ত সব কাজগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলে। হয়তো বা তুমি তোমার শেষ শপথের কথা বলছিলে, হয়তো বা ডায়েরি, হয়তোবা কোনও পাণ্ডুলিপির কথা। কি ভীষণ গুছানো তুমি, তার শেষ প্রমাণ তোমার চলে যাওয়ার পর তোমারই ব্যাগ থেকে পাওয়া তোমারই কাঁপা হাতে লেখা শেষ শপথ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তোমার ভালোবাসার চট্টগ্রামের সকলকে পড়াবে বলে…! হ্যাঁ মা, তোমার ছোট মেয়ে শারমিন চট্টগ্রামের শহীদ মিনারে তোমারই সামনে সেই শেষ শপথ পাঠ করালো। তুমি নিশ্চয়ই শুনেছো সেদিন…

‘এখন প্রতিবাদ চাই, প্রতিরোধ চাই, চাই রাজনৈতিক আদর্শিক সংগ্রাম। যারা একাত্তরে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, সেই খুনিদের সঙ্গে কোনো আপোষ হতে পারে না।

এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদের সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে সোচ্চার হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার উচ্চারিত হোক। আমাদের অতীতের সব ভুল ভ্রান্তিগুলো ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো ঝেড়ে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার শপথ উচ্চারিত হোক’। এই উক্ত শপথটি তুমি ১৪ ই ডিসেম্বর নিজেই পড়বে বলে লিখেছিলে মা। তোমার সেই ইচ্ছেটুকু অপূর্ণ থাকেনি মা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তোমার বিদায়ের ক্ষণে তোমারই সামনে আমরা সকলেই অঙ্গীকার বদ্ধ হয়ে উচ্চারিত করি তোমার এই শপথ।

আজ আমরা সব হারানো এক বিজয় দেখলাম। যে বিজয়ের লাল সূর্যে বাবাকে খুঁজি, ভোরের মিষ্টি বাতাসে তোমাকে খুঁজি! আবার রাতের আকাশে চাঁদের পাশে যে জ্বলজ্বলে তারাটা, সেই তারার নাম ধ্রুবতারা যার আরেক নাম ‘মুশতারী’। তুমিই বলেছিলে আমার ছোট বেলায়। তুমি এদেশের একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র, যে নক্ষত্র কখনো খসে পড়ে না। তুমি আকাশে ধ্রুবতারা মুশতারী হয়েই জ্বলবে, আমাদের দূর থেকে আলোকিত করবে। আমাদের চেতনায় চির অমলিন হয়ে থাকবে।

লেখক : বেগম মুশতারী শফীর কন্যা

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিদ্যানুরাগী আব্দুল হাকিম চৌধুরী
পরবর্তী নিবন্ধভূগোলের গোল