রাসুল (দঃ) সব সাহাবীদের মধ্যে তাঁর বিশেষ বিশেষ স্মৃতিময় উপহার বণ্টন করছেন, এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো রাসুল (দঃ) এর জুব্বা মোবারক। হযরত আলী (রা.) ভাবলেন তিনি যেহেতু রাসুলের ( দ.) জামাতা তিনিই হয়তো পাচ্ছেন, ওমর (রা.) ভাবলেন যেহেতু তিনি এতো বীরত্ব নিয়ে ইসলাম এর জন্য কাজ করছেন তিনিই হয়তো পাচ্ছেন, আবু বকর (রা.) ভাবলেন তিনি যেহেতু প্রিয় বন্ধু তাঁকেই হয়তো জুব্বা উপহার দেয়া হবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আল্লাহর রাসুল (দ.) বললেন এ জুব্বা ওয়ায়েস করনী এর। সবাই তো অবাক, কে এই ওয়ায়েস করনী? কার জন্য এতো ভালোবাসা। এ জুব্বা পৌঁছানোর দায়িত্ব দিলেন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কে।
জবাবের জন্য সাহাবীদের অপেক্ষা করতে হলো বহুকাল। রাসুল (দ.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আরবের ক্ষমতার মসনদে ওমর (রা.)। হজ্বের মৌসুম চলছে, দেশ বিদেশ থেকে হাজারো হাজি উপস্থিত। হযরত ওমর (রা.) বললেন ইয়ামেন এর করন শহর থেকে আগত ওয়ায়েস নামের কেউ কি উপস্থিত আছেন? একজন উঠে বললেন জ্বি হ্যা আমিরুল মুমিনীন আমার ভাতিজা হলো ওয়ায়েস করনী। সে তো আরাফাতের দিকে গেলো তাঁর ছাগল নিয়ে।
ইতিমধ্যে আলী (রা.) ও উপস্থিত হলেন, হযরত ওমর (রা.) সহ দুইজন দৌঁড় দিচ্ছেন আরাফাত এর দিকে। দেখলেন সাধারণ এক মধ্য বয়েসী মানুষ বসে আছেন, তারা দুজন কাছে গিয়ে বললেন কি নাম আপনার? বললো ওয়ায়েস করনী।
আলী (রা.) ও ওমর (রা.) বললেন, আপনি দু’হাত তুলে আমাদের জন্য দোয়া করেন, আল্লাহর রাসুল (দ.) বলেছেন, আপনি দোয়া করলে আল্লাহ সে হাত ফেরত দেন না, সাথে রাসুল (দ.) এর জুব্বাও উপহার দিলেন। এবার জানতে চাইলেন কি এমন কাজ করেছেন যে আপনার এতো মর্যাদা আর আল্লাহর রাসুল (দ.) আপনাকে তাঁর জুব্বা মোবারক দিলেন। ওয়ায়েস করনী বলেন, আমি আমার মায়ের খেদমত করেছি, আমার মা খুব অসুস্থ থাকায় আমি আল্লাহর রাসুল (দ.) এর কাছে এসে ইসলাম কবুল করতে পারিনি, কিন্তু মায়ের শেষ দিনগুলোতে তাঁর কাছে থেকে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করেছি, হয়তো এর জন্যই এতো প্রাপ্তি।
পৌরাণিক চীনা গল্পে আছে, এক প্রেমিকা প্রেমিককে বলল, তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে চাই আমি। কী পরীক্ষা নেবে? সব পরীক্ষার জন্য আমি প্রস্তুত। যাও, তোমার মায়ের হৃদপিণ্ডটা নিয়ে আসো। প্রেমে অন্ধ প্রেমিক ছুটল মায়ের কাছে। মাকে হত্যা করে তাঁর হৃদপিণ্ড নিয়ে ছুটলো প্রেমিকার কাছে, ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করতে….! পথে হঠাৎ আছড়ে পড়ল প্রেমিক। হাত থেকে ফসকে গেল মায়ের তাজা হৃদপিণ্ড। তখনো ধক ধক করছে…মায়ের হৃদপিণ্ড এবার কথা বলে উঠলো, ‘কিরে খোকা, ব্যথা পেলি?’
পৌরাণিক চীনা গল্পের মতো বিরল ঘটনার জন্ম দিলেন চট্টগ্রােেমর ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউপির বাসিন্দা এবং ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ আজাহারুল ইসলামের ছেলে ডা. মাসুদুল করিম। একদিকে বাবা মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত, অন্যদিকে মায়ের লিভারে টিউমার ধরা পড়েছে। চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩০ শতাংশ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে মায়ের। কোথায় পাবে, কে দেবে এই দুষ্প্রাপ্য লিভার। তাই মাকে বাঁচাতে নিজের লিভার দান করতে যাচ্ছেন ফটিকছড়ির তরুণ চিকিৎসক ডা. মাসুদুল করিম। তিনি সদ্যসমাপ্ত কুমিল্লা ময়নামতি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন।
বেশ কিছুদিন আগে তার মায়ের লিভার টিউমার ধরা পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ও টিমের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩০ শতাংশ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে হচ্ছে। এজন্য ভারতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে ডা. মাসুদের মাকে। এদিকে ডা. মাসুদের মায়ের অসুস্থতা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন এফডিএসআরের স্টুডেন্টস উইংয়ের আহ্বায়ক ডা.জোবায়ের রাফি। তিনি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আন্টির চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক টিম সিদ্ধান্ত দিয়েছে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করাতে হবে। কীভাবে করবে সবাই চিন্তিত। কে দেবে আন্টিকে লিভার (কলিজা)। হন্য হয়ে খোঁজ করতে লাগল।
কিন্তু কীভাবে সম্ভব? যে দেশে মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত লাগলে হন্য হয়ে খুঁজতে হয়। একজন সুস্থ মানুষ রক্ত দিতে ভয় পায়, সে দেশে কলিজা ডোনেট! কল্পনার রাজ্যে বসবাস ছাড়া কিছুই নয়। পরিবারের অন্য সবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। ছোট বোন, ছোট ভাই আর মাসুদের সাথে সবকিছু ম্যাচ করে, বাকি ভাইবোন দুজনের বয়স কম। এখনো সবকিছু বোঝার ক্ষমতা হয়ে ওঠেনি। মাসুদ সিদ্ধান্ত নিল ওর আম্মুকে বাঁচাতে হলে নিজেকেই কিছু একটা করতে হবে। মাসুদ কঠিন সিদ্ধান্ত নিল, ওর কলিজা দিয়ে আম্মু বেঁচে থাকবেন। এর থেকে ভালো কাজ জীবনে কি হয়? মাসুদের কলিজার ৩০ শতাংশ ওর আম্মুর জন্য ডোনেট করবেন। আমি তো বলি, ৩০ শতাংশ কলিজা তো কেটে দেবে মাত্র। ও তো পুরো কলিজাটাই মা-বাবার জন্য দিয়ে দিয়েছে। ডা.মাসুদ তার পিতামাতার গর্বিত সন্তান। তাকে জানাই অভিবাদন।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।












