নগরীর খুলশীস্থ পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় থেকে কোর্টহিলের দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। সিএনজি বা প্রাইভেটকারে যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট। অথচ চার বছরেও এ পথ মাড়িয়ে পরিবেশ আদালতে সাক্ষ্য দিতে পৌঁছাতে পারছে না পরিবেশ অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা। পরিবেশ দূষণের অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রথমে তাদেরকে সমন দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী হাজির না হওয়ায় পরে ইস্যু করা হয় ওয়ারেন্ট অব উইটনেস (ডব্লিও ডব্লিও)। এক, দুই বার নয়–এ পর্যন্ত ১৯ বার ওই দুই কর্মকর্তাকে হাজিরের লক্ষে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার বরাবর এ প্রসেসটি ইস্যু হয়েছে। আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত পরোয়ানাটি তামিল হয়নি আজও– ফলে থমকে আছে জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন– যেখানে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের মূল দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত, সেখানে তাদেরই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কেন বছরের পর বছর ধরে আদালতের প্রসেসকে গুরুত্ব দিচ্ছে না? সমন ও ওয়ারেন্ট অব উইটনেসসহ ২০ বার প্রসেস ইস্যুর পরও এই ধরনের তালবাহানা বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি এক ধরনের উপহাস বৈকি কিছু নয়। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রিতায় আসামিরা আইনগত ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
মামলার নথি ঘেটে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৭ মার্চ চট্টগ্রামের দক্ষিণ জনপদের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের খান বটতল এলাকার ‘মেসার্স খাজা ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং’ ইটভাটায় অভিযান চালায় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা। এতে দেখা যায়, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই চিমনি নির্মাণ ও ইট পোড়ানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইটভাটাটি। এ ঘটনায় ৯ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক নাজনীন সুলতানা নীপা বাদী হয়ে ২ জনের বিরুদ্ধে চন্দনাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তারা হলেন– ইটভাটা মালিক মো. বদিউল আলম ও মোহাম্মদ সোলেমান। তদন্ত শেষে সংস্থাটির আরেক সহকারী পরিচালক মো. আফজারুল ইসলাম একই বছরের ২৪ জুন এ দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিট বলা হয়, আসামিরা ইট পোড়ানোর উদ্দেশ্যে জিগজ্যাগ কিলন ও চিমনি নির্মাণ করেছেন। পরিবেশগত ছাড়পত্র ব্যতীত ইটভাটা স্থাপন করে তারা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছেন। যা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আদালতসূত্র জানায়, তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক চার্জশিট দাখিল পরবর্তী ২০২২ সালের ১ আগস্ট পরিবেশ আদালত, চট্টগ্রামের তৎকালীন বিচারক সানজিদা আফরীন দীবা দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয় জানিয়ে আদালতের বেঞ্চ সহকারী দৈনিক আজাদীকে বলেন, এ মামলার চার্জশিটভুক্ত মোট সাক্ষীর সংখ্যা ৪ জন। তারা হলেন– পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নাজনীন সুলতানা নীপা (বাদী), মো. আফজারুল ইসলাম (তদন্ত কর্মকর্তা), নমুনা সংগ্রহকারী চন্দন বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষদর্শী বিকাশ চৌধুরী। এরমধ্যে আফজারুল ইসলাম ও বিকাশ চৌধুরী ইতোমধ্যে সাক্ষ্য দিয়ে ফেলেছেন। বাকী থাকে দুইজন। সমন ও ওয়ারেন্ট অব উইটনেস ইস্যু করা হলেও এখনো তারা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি। কতবার সমন দেওয়া হয়েছে তা জানতে বেঞ্চ সহকারী বলেন, মামলার বাদী নাজনীন সুলতানা নীপা ও নমুনা সংগ্রহকারী চন্দন বিশ্বাসকে প্রথমে সমন দিয়ে ডাকা হয়েছিল, ২০২২ সালের ১ আগস্ট। এরপর তাদেরকে হাজির করার জন্য সিএমপি কমিশনার বরাবর ওয়ারেন্টস অব উইটনেস ইস্যু করা হয়। এ পর্যন্ত ১৯ বার ওয়ারেন্ট অব উইটনেস ইস্যু করা হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত তারা আদালতে আসেননি বা তাদেরকে হাজির করা হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ জুলাই ওয়ারেন্ট অব উইটনেস ইস্যু করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী ২২ অক্টোবর এ মামলার পরবর্তী ধার্য্য দিন। সাক্ষী হাজির হচ্ছে না। এমন অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে– জানতে চাইলে বেঞ্চ সহকারী বলেন, নিয়ম হচ্ছে– শোকজ করা। জানা গেছে, নাজনীন সুলতানা নীপা ও চন্দন বিশ্বাস দুজনই পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন। চন্দন বিশ্বাস গত রোববার দৈনিক আজাদীকে জানান, আদালতের সমন, ওয়ারেন্ট বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ম্যাডামের সাথে এ বিষয়ে তিনি কথা বলবেন।
সিনিয়র আইনজীবী ও সচেতন নাগরিক সমাজ (সনাক)- টিআইবি চট্টগ্রামের সদস্য (সাবেক সভাপতি) আকতার কবির দৈনিক আজাদীকে বলেন, নিজ দপ্তরে কাজ করা যেমন দায়িত্ব। আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেওয়াও সরকারি কর্মকর্তাদের সম–দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কর্মঘণ্টার মধ্যেই আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কতবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়– অথচ বিষয়টি তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। ভূমিকে বাসযোগ্য ভূমি হিসেবে রাখার দায়িত্ব তো পরিবেশ অধিপ্তরের। তাদের খামখেয়ালিপনা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে ‘অন্য কিছু’ আছে কি না সংশ্লিষ্টদের তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ মামলায় বছরের পর বছর সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত হচ্ছে না যারা তাদেরকে সাসপেন্ড করা দরকার–ডিপার্টমেন্টাল মামলাও করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আদালতে যে মামলাটি চলছে– সে বিষয়টি নিয়ে তো তারা নিশ্চিতভাবেই অবগত আছেন। কার্যালয়ে তালিকা থাকার কথা। সে অনুযায়ী মনিটরিং হওয়ারও কথা। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুরুত্বহীন হয়ে পড়লে সবাই আইন ভঙ্গ করার ক্ষেত্রে উৎসাহি হবে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন বলেন, সমন, ওয়ারেন্ট তামিল না হলে আদালতের আরো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। কেন সাক্ষী আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল না–সে বিষয়ে কৈফিয়ত আদালত চাইতে পারেন। তিনি বলেন, ২০ বার প্রসেস ইস্যুর পরও সাক্ষী অনুপস্থিতির বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখবো না। পরিবেশ দূষণের পেছনে যারা রয়েছেন, তাদের শাস্তি না হলে এমন অপরাধ ঘটতেই থাকবে। সেহেতু বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।












