পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে টানাবৃষ্টিতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় ডুবে যায় বিস্তীর্ণ জনপদ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেত–খামার, বাগান, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট–বাজার, সড়ক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখন বন্যার পানি নামলেও ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন।
জেলার সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গিয়েছে যে, কৃষি, সড়ক ও মৎস্যখাতে ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকার। সর্বস্বান্ত হয়েছেন কৃষক ও প্রান্তিক খামারিরা। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, রাজস্থলীসহ ১০ উপজেলায় অতিবৃষ্টির ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে।
জেলার দুর্গম বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ফারুয়া বাজারের ফার্মেসি দোকানদার কিনারাম তঞ্চঙ্গ্যা। কিনারাম তঞ্চঙ্গ্যা শারীরিকভাবে কিছুটা অক্ষম মানুষ। বন্যায় দোকান ডুবে যাওয়ায় আপাতত খোলা জায়গায় বসে ওষুধ বিক্রি করছেন তিনি। জানতে চাইলে কিনারাম বলেন, হঠাৎ বন্যার পানিতে দোকান ডুবে যায়। এখন দোকানে বসে বেচাবিক্রির সুযোগ নেই। তাই বাইরে খোলা আকাশের নিচে বসে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে।
জেলাটিতে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নের ১৫–১৬টি গ্রামের প্রায় ১৪০০ পরিবার ও ফারুয়া বাজারের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। জানতে চাইলে ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, বন্যার পানি নেমেও গেলেও এখন এখানকার মানুষদের পুনর্বাসন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অনেকেই ঘর–বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একেবারেই নিঃস্ব। পার্বত্য এই জেলাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলার কৃষিখাতে। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্নের ফসল। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি জেলার উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, জেলার ১০টি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে গ্রীষ্মকালীন শাক–সবজি ১ হাজার ১৩৬ হেক্টর, উফশী আউশ ৬৯৯ হেক্টর, স্থানীয় আউশ ৪৬১ হেক্টর, আদা ৪২২ হেক্টর, হলুদ ৩৪৪ হেক্টর, উদ্যান ফসল ৪১০ হেক্টর এবং আমন ২০৩ হেক্টর জমি রয়েছে। পানি পুরোপুরি কমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে, রাঙামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন সড়কের ২৬টি স্থানে প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম–রাঙামাটি, বান্দরবান–রাঙামাটি, রাঙামাটি–খাগড়াছড়ি, রানীরহাট–কাউখালী এবং মহালছড়ি–নানিয়ারচর সড়কের পিচ ও গাইড ওয়াল ধসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে সড়ক বিভাগের ক্ষতি প্রায় ৯ কোটি টাকা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী আহামদ শফি বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আমাদের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত ৬০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাঙামাটি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, মাছের কৃত্রিম জলাশয় (ক্রিক), ব্যক্তিগত পুকুর ও পোনা নার্সারি ডুবে গিয়ে মৎস্য খাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু সাদাত মো. সায়েম জানান, পাহাড়ি ঢলে ২৪টি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে ১০টি গরু ও ২ হাজার ৪০০ মুরগি। এছাড়া ৭০৮ একর চারণভূমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং নষ্ট হয়েছে ১ হাজার ১২ মেট্রিক টন খড় ও ৮০ টন কাঁচা ঘাস। এতে ক্ষতি হয়েছে ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।












