জীবন এক বহতা নদী। দিন যায় মাস যায়। জীবন জীবনের মত চলতে থাকে। আমাদের যার যার জীবন চলছে যার যার মত করে।
চলার পথে কিছু স্মৃতি কিছু মানুষ আমাদের জীবনে দাগ কেটে যায়। যা আমৃত্যু আমরা বয়ে বেড়াই। জীবনে একজন বিশেষ মানুষের কথা আজকে আমি লিখব। তিনি আমার একজন প্রাণপ্রিয় শিক্ষক জাহানারা আপা। গত ৪ জুলাই ২০২৩ সালে ৮২ বছর বয়সে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। জাহানারা বেগম ১৯৬২ সালে ডাক্তার খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি আজীবন ডাক্তার খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালে তিনি শিক্ষাগতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। আমি খাস্তগীর স্কুলের একজন প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে আপাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছি। ১৯৮৪ সালে আমি খাস্তগীর স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হই ভর্তির দিন আমার আম্মা জুলেখা খাতুন স্কুলে ভর্তি করানোর পরে তার কলেজ বান্ধবী জাহানারা বেগমের সাথে আমাকে দেখা করানোর জন্য নিয়ে গেলেন। আপা আমাকে দেখেই বললেন ও রিফাতের বোন ! এখানে বলে রাখি ঐবছরই আমার বড় বোন খাস্তগীর স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। অংকে আমার বোন খুব ভাল ছিল সে কারণে জাহানারা আপা তাকে খুবই আদর করতেন। আম্মা আপার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর আপা আমাকে দেখে প্রথমে প্রশ্ন করলেন ‘অংকে কেমন তুমি?’ আমি বললাম ভালোই। আমি ছোটবেলা থেকেই একটু গান আবৃত্তি যে কোন সাংস্কৃতিক দিক থেকে খুব সক্রিয় ছিলাম। সেই সুবাদে স্কুলের সবকিছুতেই অংশগ্রহণ করতে লাগলাম। স্কুলের পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসেবে সবসময় কাজ করেছি। স্কুলের প্রতিদিনের এসেম্বলিতে কমেন্ট দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। এসব নানা কারণে স্কুলের সকল আপাদের চোখে আমি পড়ে গেলাম। স্কুলের রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা এবং স্কুলের যেকোনো কাজে ডাক পড়া।
আপাকে আমরা সেই ছোটকাল থেকে খুব ভয় পেতাম। কিছুটা তো রাগী ছিলেনই তারপর অংকের টিচার হওয়াতে সবাই কমবেশি তাকে ভয় পেতো। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন আপা আমাদের অংক এবং বিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসাবে ক্লাস নিতেন। আমার সব বন্ধুরা কমবেশি সবাই আপাকে খুব ভয় পেত। আমি অংকে ভালোই ছিলাম। মনে মনে একটা চ্যালেঞ্জ নিলাম আপার কাছে ভালো নাম্বার পেতে হবে অংকে। আমরা যখন ক্লাস টেনে পড়ি আপার হাতে প্রি টেস্টে আমি অংকে ৯৭ পেলে আপা খুব খুশি হলেন। বিশেষ করে, ১৯৮৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় গণিত এবং বিজ্ঞানে লেটারসহ এসএসসি পাস করলাম । আপা বুকে টেনে নিলেন।
আমার আম্মা ১৯৯৫ সালের জুন মাসে মারা গেলেন। আপা আমাদের বাসায় এসে অনেক সান্ত্বনা দিলেন। ২০০৭ সালে কাস্টিং ১০০ বছরের প্রোগ্রামের আপা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে একশ বছরের প্রোগ্রামের খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। ১০০ বছরের প্রোগ্রামের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করায় আমি আপাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি ২০১৮ তে ১০০ বছরের প্রোগ্রাম যখন আমরা করি তখনও সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছি। ১১১ বছরের প্রোগ্রামের প্রাক্তন শিক্ষিকাদের আমরা সংবর্ধনা দিয়েছিলাম। সম্মাননা পেয়ে আপা অনেক খুশি হয়েছিল কিন্তু আপা অসুস্থতার কারণে আমাদের প্রোগ্রামে আসতে পারেনি। পরে আমরা ছাত্রীরা বাসায় গিয়ে আপার হাতে সম্মাননাটা দিয়ে এসেছিলাম। গত সাত আট বছর ধরে আপা প্রায় দুতিন মাস পর পরই আমাকে মোবাইলে ফোন করতেন এবং অনেক গল্প করতেন। আমার হয়তো ব্যস্ততার কারণে আপাকে ফোন করা হত না তাই মাঝে মাঝে বকা দিয়ে বলতেন তুমি কি এমন ব্যস্ত যে একটা ফোন করতে পারো না? তবে মাঝেমাঝে আপাকে দেখতে গিয়েছি বাসায়।
আমার শিক্ষকতা জীবনের দীর্ঘ ২৮ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি চিটাগাং গ্রামার স্কুলে প্রায় ২০ বছর কাজ করেছি সেই সুবাদে আপার বড় নাতি আমার ছাত্র ছিল। আপার বড় ছেলের বউ যখন এসে আমাকে পরিচয় দিলেন যে উনি জাহানারা আপার বড় ছেলের বউ এবং স্বপ্নের আপার বড় নাতি তখন আমার খুব অবাক লাগলো আমার টিচারের নাতিকেই আমি পড়াচ্ছি। দুদিন পরে আপা আমাকে টেলিফোন করলেন বললেন তুমি আমার নাতির দিকে খেয়াল রাখবে।
শুরুর দিকে যা বলছিলাম আপা ছাত্রী হিসেবে আমার বড় বোনকে অসম্ভব আদর করতেন। তাই আপার মৃত্যুর পর আমার বড় বোন তার ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দিয়েছে সে স্ট্যাটাসটা আমি এখানে তুলে ধরলাম আমার বোনের অনুমতি নিয়ে। ‘আজ আমি এমন একজনকে হারালাম, যার প্রভাব ছিল আমার জীবনে বাবা–মার পরেই, তিনি আমার স্কুল শিক্ষিকা জাহানারা আপা। ব্যক্তিগত জীবনে উনি আমার আম্মার সহপাঠী ছিলেন, উনি আর আমাদের সুরাইয়া আপা দুই জনই আম্মার সহপাঠী ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজে। আমি যখন প্রথমবার আবৃত্তি আর বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আংশগ্রহণ করেছিলাম তখন তিনিই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মানবিক বিভাগে আসতে তিনিই আমাকে সাহায্য করেছিলেন। আমি উনার ভলোবাসার জন্যই মর্নিং শিফটে থেকে গিয়েছিলাম মানবিক বিভাগ নিয়ে। ২০০৩ সালে উনি ওমরা করতে গিয়ে আমাকে ফোন দিয়ে বলে ছিলেন “রিফাত”, আমি তোমার জাহানারা আপা বলছি।” আমি তখন উনার গলা শুনে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম। জেদ্দায় উনার সাথে দেখা করে তৃপ্তি অনুভব করেছিলাম। তারপর দেশে দুই একবার দেখা হয়েছিল। শেষবার উনার সাথে আমার দেখা হয়েছিল ২০১৬ সালে মসজিদুল নববীতে (মদিনায়)। উনার সাথে আমার অনেক স্মৃতি। আজ আমি এমন একজনকে হারালাম, যার প্রভাব ছিল আমার জীবনে বাবা–মার পরেই, তিনি আমার স্কুল শিক্ষিকা জাহানারা আপা। ব্যক্তিগত জীবনে উনি আমার আম্মার সহপাঠী ছিলেন, উনি আর আমাদের সুরাইয়া আপা দুই জনই আম্মার সহপাঠি ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজে। আমি যখন প্রথম বার আবৃত্তি আর বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম তখন তিনিই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মানবিক বিভাগে আসতে তিনিই আমাকে সাহায্য করেছিলেন। আমার জীবনে তাঁর প্রভাব ভুলবার নয়।