
আমি একেবারেই ছোট। সম্ভবত ক্লাস ওয়ান বা টু তে পড়ছি। গহিরা প্রাইমারী স্কুলে। আমরা গহিরা স্কুলের ক্যাম্পাসে কোয়ার্টারে থাকতাম। আমার বাবা গহিরা এ জে ওয়াই মাল্টিলেটারেল হাই স্কুলের হেড মাস্টার। কিছুদিনের মাঝেই তিনি হাইস্কুলটিকে কলেজে রূপান্তরিত করে কলেজের প্রিন্সিপাল হলেন। তো আমরা যেখানে থাকতাম সেটাকে কিন্তু বাড়ি বলতাম না, বলতাম আমাদের বাসা। কারণ আমাদের বাড়ি ছিল। আমার দাদার বাড়ি এয়াছিন নগরের মোহাম্মদ তকির হাটস্থ সর্তা খালের তীর ঘেঁষে একেবারে যাকে বলে খালকূল। আমরা দুই ঈদেই কিন্তু বাড়ি চলে যেতাম। ঈদে বাড়িতে গেলে অন্যরকম পরিবেশ পেতাম। দুই ঈদের আনন্দ আর আয়োজনে ছিল ভিন্নতা। কুরবানীর জন্য বিরাট গরু কেনা হতো। একান্নবর্তী বিশাল পরিবার, চাচা, জ্যাঠা, আমার দাদা দাদী, চাচাতো খুড়াতো ভাইবোনেরা। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, আলু, বেগুন, মরিচ, শাক আনাজ সবই নিজেদের খেতের। বাড়ির সামনে কি সুন্দর করে বয়ে গেছে সর্তা খাল। সেই খাল একশ্রোতা। খালের পানি উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণে বয়ে হালদা হয়ে পড়েছে কর্ণফুলীতে। আমাদের বাড়ির ঈদগাহ আর কবরস্থান সেই খালের অপর পাড়ে। সেখানে এক বিশাল মাঠ। আর মাঠের মাঝখানে একটি বড় পাকুড় গাছ। আমি প্রতি ঈদে নতুন জামা কাপড় পড়ে আমার বাবার হাত ধরেই ঈদের জামায়াতে যেতাম। সাথে আমাদের তুতো ভাই বোনেরা ও থাকতো। বাবার নামাজে দাঁড়ালে, আমরা পিচ্চিরা সেই ডালপালা আর শিকড় বাকড় ছড়ানো বৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় বসে থাকতাম। ফুল কুড়াতাম। কুরবানী ঈদের আগের রাতেই আমরা গহিরার বাসা থেকে বাড়ি আসতাম। আমার দাদা দাদী সহ অন্যরা খুবই খুশি হতেন। পুরা বাড়িই যেনো আমাদের আগমনের অপেক্ষায় থাকতো। আমার জ্যাঠা আর জেঠীমা আমরা ডঅর মা, জেঠাকে বলতাম ডঅর বাবা। আর চাচাকে গুন্নিবাবা। কিন্তু চাচীকে চাচী আম্মাই ডাকতাম। অন্যদিকে আমার বাবাকে সবাই ডাকতো খুলু বাবা। খুলু মানে খুইল্যা। আমরা বাড়ি এলেই চাচী জেঠীরা রান্না বান্না পিঠাপুলি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কুরবানীর আগের রাতে চালের রুটি বানানো হতো। আর সেই রাতে আমরা চাঁদের আলোতে উঠোনে খেলতাম। আমার চাচা উঠোনে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন, আর আমরা উনার চারিপাশে গোল করে বসতাম। উনি কিস্তা (গল্প) বলতেন। কি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। আর বাড়ি যাবার আরেকটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল আমার চাচার সাথে হাটখোলায় যাওয়ার আনন্দ। তিনি ছিলেন দিলখোলা এক মানুষ। তিনি আমাদের প্রতিবেলায় হাটে নিয়ে চায়ের দোকানে বসিয়ে দিতেন। খুব মজার ছানার রসগোল্লা আর ছানার আমৃত্তি,গুলগুলা (মালপোয়া) এসব খেতাম পেট ভরে। খেয়েদেয়ে পেট টিম টিম করে আমরা চাচার সাথে গল্প করতে করতে খালপাড়ের সরু রাস্তা ধরে বাড়িতে পৌঁছাতাম। চলতি পথে বুনোফুল, বুনো লতাপাতার মায়া আর ছায়া। গাছে গাছে সিজনাল ফল, আতা, শরীফা, কলা পেয়ারা কত কি, খালপাড় ঘেঁষে মিষ্টি আলুর খেত, অনেকটা জুম চাষের মতোই। আলু শাক, মিষ্টি আলু খেত থেকে তুলেই খেয়ে ফেলতাম। আবার দাদীরা চুলার ছাই আগুনে আলু পুড়ে রাখতেন। আমাদের খেতে দিতেন। আগের রাতে গরুকে দেখতাম খুব কাছে থেকে। গরুর শিং এর সাথে কাগজের ফুলের মালা জড়ানো থাকতো। গরুকে আমরা খানা খাওয়াতাম। আদর করতাম। কী যে মায়া লাগতো। পরের দিন কুরবানী। আমরা ঈদের জামায়াতে যেতাম। বাড়ি এসে গরু জবাই দেখতাম। আবার গরুর চামড়া দিয়ে ঢোল বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। মাটির কলসীর মুখ, নারকেলের মালায় গরুর চামড়া লাগিয়ে তা রোদে শুকিয়ে ডুম ডুম করে ঢোল বাজাতাম। এদিকে গরু জবাইয়ের পর খাবারের মহোৎসব। আমার বাবা ছিলেন ভোজন রসিক, ভোজন বিলাসীও। বড় ডেক এর রান্না। সারা বাড়ির আত্মীয় স্বজন এসে রুটি গোস্ত খেয়ে যাচ্ছেই। আমাদের আবার দাওয়াত দিচ্ছেন স্বজনরা। খালের অপর পাড়ে আমার আরেক চাচা ও জেঠার বাড়ি। সে সব বাড়িতেও দাওয়াত চলতো। কী এক মজার জীবন ছিল, কী এক অসীম আনন্দময় ঈদ ছিল।
লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক











