আলহাজ মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী প্রকাশ মোজাফফর মোক্তার ১৯০৩ সালের ২৪ জুলাই সাতকানিয়া থানার ঢেমশা গ্রামে বর্তমানে সাতকানিয়া পৌরসভা ৬নং ওয়ার্ড, চরপাড়া) সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বুজরুচ মেহের চৌধুরী এবং মাতা ছিলেন মোছাম্মৎ হালিমা খাতুন। ১৯১৭ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় চলে যান। আইন বিষয়ে শিক্ষা অর্জন শেষে দেশে ফিরে চট্টগ্রাম আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। তিনি ছিলেন প্রতিথযশা আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা বার এসোসিয়েশনের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য, পটিয়া মহকুমা সদর বারের সাধারণ সম্পাদক, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সাবেক সভাপতি ও সাতকানিয়ার অবিভক্ত ঢেমশা ইউনিয়নের ছত্রিশ বছর যাবত দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান।
তিনি অনেক জনহিতকর কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠা করেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ সাতকানিয়া কলেজ (পরবর্তীতে সাতকানিয়া সরকারি কলেজ)।
তিনি ছিলেন দানবীর। সাতকানিয়া ডাক বাংলো প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন। নিজের অর্থায়নে সাতকানিয়াবাসীর বহুল প্রত্যাশিত চেমন আরা সড়ক নির্মাণ করেন এবং কলেজ রোড সংলগ্ন নিজের জমির উপর দৃষ্টিনন্দন ‘মোজাফফর মোক্তার মসজিদ’ নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি সাতকানিয়া এবং চট্টগ্রাম শহরের অনেক স্কুল, এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নের সাথেও জড়িত ছিলেন।
সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার থেকে তিনি সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার টি. কে. অর্থাৎ তমগায়ে খেদমত উপাধিতে ভূষিত হন। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সমিতি ঢাকাসহ বিভিন্ন সংগঠন তাকে মরণোত্তর পদকে ভূষিত করেন।
জাতীয় পার্টির এরশাদ সরকারের আমলে সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম-বিন-খলিল চৌধুরীর উদ্যোগে যোগাযোগ মন্ত্রী মাননীয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে কলেজ পর্যন্ত সড়কটি ‘আলহাজ্ব মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সড়ক’ নামে উদ্বোধন করেন।
তিনি ছিলেন খুবই ধর্মভীরু। প্রতিদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়ে মুখস্থ কোরআন তেলোওয়াত করে ‘মোক্তার বাড়ি’র ঘুরানো বারান্দা এবং বাগানে মর্নিং ওয়াক ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
তিনি ছিলেন ঐতিহ্যগতভাবে সম্ভ্রান্ত পরিবারের। তাঁর বাবা ছিলো একজন সৌখিন মানুষ। তাঁর বাবার মতো তারও একটি ঘোড়া ছিল। তিনি গ্রামের বাড়ি গেলে গাড়ির হর্ণ শুনে ঘোড়াটি তাকে এগিয়ে নিতে আসত। তাঁর ইন্তেকালের পর ঘোড়াটি তার কবরের পাশে শুয়ে শুয়ে কাঁদত। অল্প কদিন পর ঘোড়াটিও মারা যায়। তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম মহানগরীর সিরাজুদ্দৌলা রোডে ২১ অক্টোবর দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন।
চলাফেরায় বিলাসবহুল অত্যাধুনিক মডেলের বেশ দামী গাড়ি ব্যবহার, চলনে-বলনে, কথা-বার্তায় আভিজাত্য রক্ষা করে চললেও তিনি ছিলেন গরীবের অন্তঃপ্রাণ। আদালতে গরিব ও নির্যাতিত মানুষের অভিযোগ প্রাথমিক দৃষ্টিতে সত্য প্রতীয়মান হলে তিনি বিনা ফিতে মামলা পরিচালনা করে তাদের অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক নজির রেখে গিয়েছিলেন।
তার দরজা মেহমান ও গরিবদের জন্য সব সময় খোলা ছিল। কেউ কোনো সময় না খেয়ে তার ঘর থেকে যেতে পারে নি।
তাছাড়া অসংখ্য গরিব মেয়েকে নিজ খরচে বিয়ে দিয়ে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতাকে উদ্ধার করেছেন।
মরহুম মোজাফফর আহমদ মোক্তারের মেঝো মেয়ে হাসিনা আকতার কোহিনুর এর জবানিতে তার বাবা সম্পর্কে বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। ঊনিশ শত একাত্তর সালের একুশে অক্টোবর বাবার চলে যাওয়ার খবর শুনে চট্টগ্রামে বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। সর্বশ্রেণির মানুষের অংশ গ্রহণে বিশাল জানাযার নামাজে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিলে।
মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো যে, কত বেদনাদায়ক, কত কষ্টকর তা একমাত্র আমাদের মত শিশু বয়সে পিতৃহারা সন্তানরাই জানে।
আমাদের বৈঠক খানায় রাখা সাদা কাফনে জড়ানো বাবার মায়াভরা মুখটা ছাড়া তেমন কোনো স্মৃতি মনে না পড়লেও মা, নানু, আত্মীয়-স্বজন, মরহুম অ্যাডভোকেট বদিউল আলম এবং বাবার বন্ধু আমার খালু মরহুম অ্যাডভোকেট আহমেদুর রহমান সাহেব থেকে বাবার শৌর্য বীর্যের কথা জানতে ফেরেছি। আজ আমি শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করছি। বাবা সম্পর্কে জানা সবার বর্ণনা মতে বাবাকে আমার মানসপটে আঁকতে চেষ্টা করেছি। বাবা ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সিংহ পুরুষ। আইনের শাসন প্রত্যাশী প্রতিথযশা আইনজীবী, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে সংগ্রাম রত শিক্ষানুরাগী, সব ধরনের কল্যাণ কাজে সাহায্যকারী দানবীর, সমাজ সংস্কারে বিভোর সমাজসেবক, গরিবের দুঃসময়ে সাহায্যকারী গরিবের বন্ধু, উন্নয়নের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাহসী, স্পষ্টবাদী, ধর্মভীরু, নিরহংকারী, অসম্ভব জনপ্রিয় ও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী একজন নেতা ছিলেন। আমার মরহুম বাবা মোজাফফর আহমদ চৌধুরী টি কে আমাদের আদর্শ, আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব ও আমাদের প্রেরণা। এমন একজন ক্ষণজন্মা খ্যাতিমান পুরুষের ঔরসে জন্মগ্রহণ করে আমরা আজ ধন্য। মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি। ‘রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানী সাগিরা’। আল্লাহ আমাদের বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন। আমিন।’
তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর বাজালিয়ার জমিদার বদিউর রহমান সিকদারের মেয়ে আম্বিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। পরে চন্দনাইশ থানার বরকল গ্রামের আবদুস জাব্বার চৌধুরীর মেয়ে রেজিয়া বেগমকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন চার মেয়ে সন্তানের জনক। ২১ অক্টোবর ছিলো তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।
লেখক: প্রাবন্ধিক