যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সমঝোতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান প্রথমবারের মতো সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসেছে। তবে শান্তি আলোচনা শুরুর আগেই লেবানন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের দাবি, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার কোনও অর্থ নেই। এমন অবস্থার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নতুন করে হামলার হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হলে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র টোল আরোপ করবে। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল আলোচনায় বসে। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অপরদিকে, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আলোচনায় অংশ নিয়েছে পাকিস্তান ও কাতার। বৈঠক শুরুর আগেই ইরান স্পষ্ট করে দেয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে লেবানন পরিস্থিতি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার শেয়ার করা এক ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেন, ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গত ১৮ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রথম শর্তই ছিল লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নই হবে সুইজারল্যান্ডের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। ইরানের আধা–সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, সমঝোতা চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন না হলে তেহরান আলোচনা বন্ধ করে দেবে। ওই অনুচ্ছেদে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন না হলে পরবর্তী আলোচনা ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’ হয়ে পড়বে। ইরান এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে লড়াই বন্ধ না হওয়া এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত না করা পর্যন্ত তারা পরবর্তী শান্তি আলোচনা কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী নয়।
এদিকে, আলোচনায় যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি বিষয়ে অগ্রগতির আশা করছেন। তবে একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে অবশ্যই লেবাননে তাদের অর্থায়নপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে ‘ঝামেলা সৃষ্টি’ থেকে বিরত রাখতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে কঠোর সামরিক আঘাত হানবে। ট্রাম্প লেখেন, তারা যদি তা না করে, তাহলে আমরা গত সপ্তাহের মতোই ইরানে আবার খুবই কঠোর আঘাত হানব। এবার আঘাত হবে আরও শক্তিশালী।
শান্তি আলোচনা চলার মধ্যেই এমন হুমকি তেহরান–ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। গত সপ্তাহে দুই দেশ যে প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি সই করে, তাতে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননে ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় শনিবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান। যদিও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, প্রণালিটি দিয়ে এখনো জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই নৌপথে টোল বা শুল্ক আরোপ করবে। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি দাবি করেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালে কিংবা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তি হলে কোনও টোল আরোপ করা হবে না। তবে চুক্তি ব্যর্থ হলে পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘অভিভাবকের ভূমিকা’ পালন করছে, তার ব্যয় মেটাতে টোল আরোপ করা হবে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, জুন মাসের শুরুতে পরিচালিত একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০০টির বেশি জাহাজে ১০০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল নিরাপদে পরিবহন নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বের মোট দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে যেকোনো অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইতোমধ্যে ইরানের দফায় দফায় অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্রম নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে এবং প্রণালিটি কার্যত উন্মুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, দেশটির খাতাম আল–আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে এবং ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় সুইজারল্যান্ডের আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে লেবানন ইস্যুতে ইরানের অনড় অবস্থান এবং ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারির কারণে শান্তি প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।











