অপহরণের পরও একবার ছেলের কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন বলে দাবি করে শিশু জায়হানের মা জোবাইদা বেগম বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলেকে কোথাও না পেয়ে আমি চারদিকে খুঁজেছি। ওরা আমার ছেলেকে কোনো আওয়াজ করতে দেয়নি। কিন্তু একবার আমার ছেলে ‘ও মা’ বলে ডেকেছিল। সেই ডাক আমার কানে এসেছিল। তখন তার বুক কেঁপে উঠেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কি আমার ছেলের আওয়াজ? তখন তারা বলেছিল, না, এটা আমার ছেলে নয়, অন্য কারও আওয়াজ।’ গত মঙ্গলবার পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার মো. শাহজাহান ও জোবাইদা বেগমের একমাত্র ছেলে ছিল শিশু জায়হান দুপুরে নিখোঁজ হয়। বুধবার গভীর রাতে প্রতিবেশী সাইফুদ্দিন, তাঁর স্ত্রী শানু আক্তার ও মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহার দেখিয়ে দেওয়া বাড়ির পেছনের ময়লার স্তূপ থেকে জায়হানের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হয়। স্বজনেরা থানায় ডায়েরি করার পর গতকাল দুপুরে পুলিশ জায়হানদের প্রতিবেশী সাইফুদ্দিন, তাঁর স্ত্রী শানু আক্তার ও মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহাকে (১৯) আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে জায়হানের হত্যার কথা স্বীকার করেন তাঁরা।
শিশু জায়হানের স্বজনরা জানান, দুই দিন ধরে একমাত্র সন্তানকে তন্নতন্ন সব জায়গায় খুঁজে বেড়িয়েছেন তার বাবা–মা। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, আত্মীয়স্বজনের বাসা– কোথাও বাদ যায়নি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন তাঁরা। সেই খোঁজাখুঁজির দলে ছিলেন প্রতিবেশী সাইফুদ্দিনসহ স্ত্রী শানু আক্তারও। পরিবারের কেউ যাতে সন্দেহ করতে না পারে এজন্য স্বজনদের সঙ্গে খুঁজতে বের হন প্রতিবেশী মো. সাইফুদ্দিন। বাড়ির পাশের পুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিতে অংশও নেন তিনি। একপর্যায়ে জায়হানের বাবা মো. শাহজাহানের সঙ্গে বসে চা–ও পান করেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে গিয়ে শিশুটিকে খুঁজেছেন এবং জায়হানের বাবাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। পরিবারের কেউই তখন সন্দেহ করেনি, সাইফুদ্দিন এই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কয়েকটি সম্ভাব্য স্থানে তল্লাশি চালায়। এক পর্যায়ে একটি বাড়ির ঘরের ভেতরে পাওয়া যায় ঠিক একই ধরনের একটি প্যাড, যেটির কাগজে মুক্তিপণের চিরকূট লেখা হয়েছিল। শুধু প্যাডই নয়, আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত উদ্ধার হয় ওই ঘর থেকে।
তদন্তকারীরা দেখতে পান, চিরকূট লেখার আগে কয়েকবার খসড়া বা ড্রাফট তৈরি করেছিল। সেই ড্রাফটের কিছু অংশও পাওয়া যায় ঘরটির ভেতরে। পুলিশ সুপার বলেন, যে প্যাডে চিরকূট লেখা হয়েছিল, একই ধরনের প্যাড আমরা একটি ঘরে পাই। খুঁজতে খুঁজতে ওই চিরকূট লেখার খসড়ার অংশও উদ্ধার হয়। তখন আমরা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাই, এই বাড়ি থেকেই চিরকূটটি লেখা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে ওই পরিবারের কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে। এরপর ওই বাড়ির সদস্যদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে আলাদাভাবে কিছু লেখা লিখতে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল চিরকূটের লেখার সঙ্গে কারও হাতের লেখা মিলে কি না তা যাচাই করা। তদন্তের এক পর্যায়ে ওই বাড়ির মেয়ে সাদিয়া আক্তার নিহার লেখার সঙ্গে চিরকূটের লেখার উল্লেখযোগ্য মিল খুঁজে পান তদন্তকারীরা।
পরে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে ওই তরুণী প্রথমে অন্য একজনকে জড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েন। গভীর রাতে স্বীকার করেন, মুক্তিপণের চিরকূট তিনিই লিখেছিলেন।
পুলিশ জানায়, ওই স্বীকারোক্তির পরই তদন্ত নতুন মোড় নেয়। এরপর অভিযুক্ত তরুণীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয় শিশু জায়হানের মরদেহ।
জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম আরও জানান, খুব ছোট ছোট ক্লু ধরে আমরা এগিয়েছি। চিরকূটের কাগজ, খসড়া লেখা আর হাতের লেখার মিল থেকেই আমরা মূল সন্দেহভাজনের কাছে পৌঁছে যাই। এরপর পুরো ঘটনাটি উদঘাটন করা সম্ভব হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এতে ওই তরুণী সাদিয়া সুলতানা নিহা ও তার বাবা–মাকে আসামি করা হয়েছে।












