সংগীত সময় ও জায়গার মধ্যে বিস্তৃতভাবে অতীত ও বর্তমানের প্রতিটি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে পাওয়া যায়। বিশ্বজুড়ে মানব বিচ্ছুরণের আগে পৈতৃক জনগোষ্ঠীতে সংগীতের উপস্থিতি ছিল। প্রথম সংগীত আফ্রিকায় উদ্ভাবিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয় ।পরে মানব জীবনে এটি একটি মৌলিক উপাদান হয়ে উঠে।
চিরায়ত ও চিরন্তন নৈসর্গিক প্রকৃতিকে নিংড়ে শিল্পীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভুত রং, রেখা, শব্দ বা রূপকের আশ্রয়েযে অনুভূতি প্রকাশ করে সেই অনুভূতি অন্যের মনে সঞ্চারণের মাধ্যমে একটি পরিচয় বোধের সমন্বয় ঘটানোর নান্দনিক কর্মই শিল্প বা আর্ট হিসেবে অভিহিত ।
শিল্পের প্রকাশে শব্দ, নাদ সংগীতের প্রধান অবলম্বন বা ধারক। সংগীতে যত যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহৃত হয় তার প্রতিটি অনুসংগে শব্দ ঝংকৃত হবেই এবং সেখান থেকেই সুরের আবহ সৃষ্টি করে সংগীতকে শ্রুতিমধুর ও মাধুর্যময় করে। তাই সংগীতেই মানুষের বিষয় ভাব অভিব্যক্তি সহজ ও সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়।
আবার, সংগীত ও সাহিত্যের সম্পর্ক আবহমান কাল থেকেই ঘনিষ্ঠ। এ দুটি মাধ্যমেই পৃথিবীর তাবৎ মানুষ ধর্ম, গোষ্ঠী, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে মনের ভাবকে প্রকাশ করে। প্রচীন কালের যত সাহিত্য আমরা দেখি তার সবগুলো লেখা হত গাওয়ার জন্য। সাহিত্যের প্রাচীনতম রূপ হচ্ছে কবিতা আর মনোভাব প্রকাশের শ্রেষ্ঠতম উপায় সংগীত। উপরন্তু সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে কবিতা পাঠ করাই হল সংগীত। তাই সংগীত হচ্ছে হৃদয়ের সাহিত্য।
ভাষা যেখানে শেষ সংগীত সেখান থেকেই শুরু। ‘কবিতা যেখানে শেষ, সেখানে গানের শুরু‘ এমনটাই বলেছিলেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাই কাব্য, সাহিত্য ও সংগীত আর্টের এই তিনটি বিষয়কে কোন ক্রমেই দূরত্বে রাখা সম্ভব নয়। শ্রেষ্ঠ কাব্যই গান সৃষ্টি করে, সৃষ্টি করে সংগীত।
বিষয়,ভাব,কল্পনা,উপমা,তুলনা ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ছাড়া সংগীত সৃষ্টি হয়না। তাই বিশ্বব্যাপী যুগে যুগে, কালে কালে জাতি, ধর্ম , গোষ্ঠীর বিবিধ পালা পার্বণে উৎসব নিভর্র অনেক সংগীত রচিত ও গীত হয়ে আসছে।
আমরা আগেই জেনেছি শ্রেষ্ঠ কাব্যই গান সৃষ্টি করে, সৃষ্টি করে সংগীত। যতটুকু জানা যায় মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ নিয়ে বিশ শতকের আগে কোন কবিতা লেখালেখি বা গান সৃষ্টি না হলেও বিশ শতকের গোড়ার দিকে বালা কবিতা ও গানে ঈদ নিয়ে লেখালিখি শুরু হয়।
সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ‘
কবিতাটিই সম্ভবত প্রথম ঈদ বিষয়ক কবিতা ।
মানবজাতির তথা মুসলমানদের মহামিলনের উৎসব ঈদ কে নিয়ে কবি কায়কোবাদ ‘ ঈদ আবাহন‘ একই নামে দুটি কবিতা লিখেছেন একটি তার অশ্রুমালা (১৩১১) বইতে অন্যটি অমিয়ধারা (১৩২৯) গ্রন্থে ।
শেখ ফজলুল করিম (১৮৮২–১৯৩৬) ঈদ নামে কবিতা লিখেছেন ।
কবি শাহাদাত হোসেন(১৮৯৩–১৯৫৩) লিখেছেন ‘বাংলার ঈদ‘ও ‘ঈদুল ফিতর”নামক দুটি কবিতা। দুটিই লিখেছেন ১৯২৪ সালে। কবি গোলাম মুস্তাফা(১৮৯৭–১৯৬৪) লিখেছেন ঈদ উৎসব কবিতা (প্রথম প্রকাশ ‘সওগাত‘ ভাদ্র ১৩২৬, রক্তরাগ) গীতিময়। শাওয়ালের রূপালী চাঁদ নিয়ে কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতা। কবি তালিম হোসেন লিখেছেন ‘ ঈদের ফরিয়াদ‘। কবি সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন ‘ঈদের চিঠি‘।সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন ‘ এসেছে নুতন দিন‘।আ ন ম বজলুর রশীদের লেখা ‘ঈদ আসে‘। ঈদের তাৎপর্যময় উক্তি,শব্দ,বর্ণনা এবং আনন্দের বিষয়াবলী এ সকল কবিতায় ছন্দ ও গীতরূপে থাকলেও এসকল কবিতার কোনটিই সুর সহকারে, যন্ত্রানুষঙ্গসহ, সংগীতের রূপে গাওয়া হয়নি। এটা আজ দিবালোকের মতো সত্য যে কাজী নজরুল ইসলাম ই (১৮৯৯–১৯৭৬) ঈদ নিয়ে প্রথম এবং সবচেয়ে বেশী কবিতা ও গান লিখেছেন। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এ গানটি ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় না। শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের পীড়াপীড়িতে ও তাঁর বিশেষ অনুরোধে, যখন ভারত,বিশেষত বৃহত্তর বাংলা বা কোলকাতার তৎকালীন উঠতি শৌখিন নাগরিক সমাজে,শিল্প,সাহিত্য বা সুধীমহল ও সংগীতানুরাগীদের মাঝে শ্যামাসংগীতের চরম উন্মেষ, জনপ্রিয়তা এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপের কালে ঈদ নিয়ে প্রথম লেখা এ গান প্রকাশের পর কি যে প্রচন্ড জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে তৎকালীন বিরাজিত শ্যামা সংগীতের আবহকে কি বিপুল পরিমাণ ঝাঁকুনি দিয়েছিল তা গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড বিক্রি, নজরুলের হাসি ও আব্বাসউদ্দিনের বিস্ময় ভাব প্রকাশ সে সময় আন্দাজেরও অধিক ছিল যা আজো সমান আবহে বহমান। এ গানটিই সর্বপ্রথম এবং এখনো ঈদ উৎসবের প্রধান সংগীতের রূপ পরিগ্রহ করে আছে। এ ছাড়া ‘ ঈদ মোবারক‘ ‘কৃষকের ঈদ‘ ‘ঈদের চাঁদ ‘ কবি নজরুলের বহুল আলোচিত কবিতা।
নজরুল দেখেছেন অসংখ্য মরুভূমি, বালুচর আর অনাবিল আঁখি জল পেরিয়ে এসেছে ঈদ। তিনি বলতে চেয়েছেন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে সুখদুঃখের সমভাগী হয়ে অধিকার বোধ আর দায়িত্ব পালনের মধ্যে যে প্রকৃত আনন্দ সে শিক্ষা যেন রয়েছে ঈদের মাহাত্ম্যে।
ঈদ নিয়ে নজরুল কবিতা, নাটক, গীতিবিচিত্রা লিখলেও গানই লিখেছেন বেশী। যেমন, নতুন ঈদের চাঁদ, খুশীর ঈদ,চলো ঈদগাহে,ঈদুল ফিতর,ঈদ মোবারক, ঈদ ঈদ ঈদ, আল্লাহ্ আমার মাথার মুকুট,নতুন চাঁদের তকবীর, ঈদোজূজোহার চাঁদ,ঈদোজূজোহার তকবীর শোন,ঈদ মোবারক হো,দে জাকাত দে জাকাত দে জাকাত, তোরা দে জাকাত ।
এ ছাড়াও কবি তোফাজ্জল হোসেন খান ঈদ নিয়ে চমত্কার একটি গান লিখেছেন,
‘আজ আনন্দ প্রতি প্রাণেপ্রাণে
দুলছে খুশীর নদী প্লাবনে
ঘরে ঘরে জনে জনে
আজি মুখর হব মোরা গানে গানে
ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক আজ’।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক তাঁর গানে লিখেছেন,
‘ঐদের খুশী অপূর্ণ রবে যাবে ততদিন
খোদার হুকুম হবে না কায়েম
কায়েম হবে না যতদিন’।
কবির এ গানের কথাগুলো যৌক্তিক। কারণ দুনিয়ায় খোদার হুকুমত কায়েমের মাধ্যমেই ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
কবি গোলাম মোস্তাফার কথায়, ‘আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা
মূর্তি লভিয়াছে হর্ষে
আজীকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়াছে
রাখিতে হবে সারা বর্ষে,
এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য
নিখিল– মানবের মিলন জন্য
শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক
খোদার শুভাশীষ স্পর্শে“।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগীতশিল্পী