রাঙামাটি-খাগড়াছড়িতে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, অস্ত্র হাতে মহড়া

দুই পার্বত্য জেলায় আধাবেলা অবরোধ

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ

সাজেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের সংঘর্ষের ঘটনার জেরে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্থানে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন অবরোধকারীরা। এতে রাঙামাটি–খাগড়াছড়ি সড়কসহ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন রুটে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আটকা পড়েন যাত্রী ও পর্যটকেরা। এদিকে সাজেক সড়কেও অবরোধ অব্যাহত থাকায় পর্যটনকেন্দ্রটিতে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, জেলার বাঘাইছড়ির সাজেকের উজোবাজারে (গঙ্গারাম বাজার) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে ‘ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদ’র ডাকে গতকাল ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আধাবেলা অবরোধ পালিত হয়। সকালে রাঙামাটি–খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের কুতুকছড়ি এলাকায় সাপছড়ি খামারপাড়া ও কুতুকছড়ি ধর্মঘর এলাকায় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করতে দেখা যায়। এছাড়া কুতুকছড়ি হাফবাজার থেকে ধর্মঘর পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন অবরোধকারীরা। সকাল থেকে এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও রাঙামাটি–চট্টগ্রাম সড়কে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। রাঙামাটি শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতেও যান চলাচল ও দোকানপাট খোলা ছিল। জেলা শহর থেকে বিভিন্ন উপজেলায় নৌযান চলাচলও স্বাভাবিক ছিল।

সাপছড়ি এলাকার বাসিন্দা ফিজিরিক্কি চাকমা বলেন, সকাল থেকে রাঙামাটি–খাগড়াছড়ি সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় বিশেষ কাজে রাঙামাটি বাজারে যেতে পারেননি তিনি। রাঙামাটি–চট্টগ্রাম বাস–মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ বলেন, রাঙামাটি–চট্টগ্রাম রুটে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও অবরোধের কারণে রাঙামাটি–খাগড়াছড়ি সড়কে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। রাঙামাটি জেলা লঞ্চ মালিক সমিতির রিজার্ভবাজার লঞ্চঘাটের লাইনম্যান বিশ্বজিৎ দে জানান, সকাল থেকে বিভিন্ন উপজেলায় লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল।

ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ পালনের চেষ্টা করেছেন তারা। তবে বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিংয়ের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বাধা দিয়েছে। অন্যদিকে রাঙামাটি কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, অবরোধকে কেন্দ্র করে জেলায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।

এদিকে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের সড়কে তৃতীয় দিনের মতো অবরোধ অব্যাহত রেখেছে সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল সকাল ৬টা থেকে সাজেক–বাঘাইহাট সড়কের ১০ নম্বর ও ১৪ কিলো এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা এক বিবৃতিতে দাবি করেন, উজোবাজার এলাকা দিন–রাত ঘেরাও করে রাখা হয়েছে এবং বাজারে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ভয়ে শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি ও দোকান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, সড়কে অবরোধ অব্যাহত থাকায় যানবাহন চলাচল করছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। সংগঠনটি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

এদিকে খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অবরোধে খাগড়াছড়ির সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জেলার নয়টি উপজেলাতেও সড়কে যান চলাচল কমে যায়। অবরোধের সমর্থনে জেলা সদরের ফায়ার সার্ভিস এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন পিকেটাররা। খাগড়াছড়ি–চট্টগ্রাম সড়কের বাইল্ল্যাছড়ি, পানছড়ি সড়ক ও সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।

অস্ত্র হাতে মহড়া : অবরোধ চলাকালে অস্ত্র হাতে এক ব্যক্তিকে মোটরসাইকেলে মহড়া দিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের ড্রোনের ভিডিওতে সড়কে জ্বলন্ত আগুনের পাশ দিয়ে ওই ব্যক্তিকে অস্ত্র উঁচিয়ে মোটরসাইকেলে চলতে দেখা যায়। তার সঙ্গে আরও দুটি মোটরসাইকেলে কয়েকজন ছিলেন। ড্রোনের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা গ্রামের ভেতরে চলে যান। অস্ত্র হাতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অবরোধের কারণে বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েন যাত্রী ও পর্যটকেরা। মাগুরা থেকে আসা ব্যবসায়ী মো. বায়েজিদ বলেন, তাকে মারিশ্যা যেতে হবে। কিন্তু অবরোধের কারণে কোনো গাড়ি না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ ত্রিপুরা বলেন, জরুরি কাজে মাটিরাঙ্গা যাওয়ার প্রয়োজন হলেও গাড়ি না থাকায় যেতে পারছেন না। এ ধরনের অবরোধ চান না জানিয়ে তিনি বলেন, তারা শান্তি চান।

সাজেকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত বুধবার খাগড়াছড়ি শহরে আসা পর্যটক দেওয়ান ঐশী তিন দিন ধরে যাতায়াতের ভোগান্তিতে পড়েছেন। তিনি বলেন, সাজেক বন্ধ থাকায় রাঙামাটি ঘুরে আবার খাগড়াছড়িতে ফিরেছেন। গতকাল শনিবারও অবরোধের কারণে সাজেক যেতে পারেননি। অবরোধ শেষ হলে ঢাকায় ফিরে যাবেন।

অবরোধে পর্যটন ব্যবসায়ও ক্ষতির কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। খাগড়াছড়ির হোটেল অরণ্য বিলাসের ব্যবস্থাপক আব্দুর রশীদ সাগর বলেন, কয়েক দিন ধরে পর্যটক না আসায় তাদের হোটেল ব্যবসায় ধস নেমেছে। পর্যটন মৌসুমে এভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে, তা তারা ভাবেননি।

ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা দাবি করেন, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার ৪০টির বেশি স্থানে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে পিকেটিং করা হয়েছে। অবরোধ সফল করতে সহযোগিতা করায় দুই জেলার জনগণ, যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তবে পানছড়িতে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস–সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যরা অবরোধ পালনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি মো. কায় কিসলু বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শহরের চেঙ্গী স্কয়ার, স্বনির্ভর, জিরো মাইল ও আলুটিলাসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুলিশের দুটি মোবাইল টিমও দায়িত্ব পালন করেছে। ঢাকা থেকে আসা রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। অবরোধ চলাকালে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসৈকত সংলগ্ন ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ আইন প্রত্যাহারের চেষ্টা হচ্ছে : এমপি কাজল
পরবর্তী নিবন্ধওয়াদুদ ভূইয়ার নেতৃত্বে মধ্যস্থতাকারী দল গঠনের প্রস্তাব