যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রকাশিত অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেছেন। পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে গত বুধবার এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তারা। দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকটি আজ শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা থাকলেও একদিন আগেই চুক্তিটি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর হয়ে গেছে। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান উভয়েই ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় সমঝোতা স্মারকটিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার থেকে অন্তর্বর্তী চুক্তিটি কার্যকর হওয়া শুরু হয়ে গেছে।
এদিকে ইসরায়েলকে অন্য সবার মতোই এই শান্তি প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে– তবে তাদেরকেও অন্য সবার মতোই এই শান্তি প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে। ইরানের ব্যাপারে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, মৌলিক আচরণে পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি অর্থনৈতিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে রেখেছে এবং যতক্ষণ না তারা তাদের আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আনছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই চাপ শিথিল করব না, বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে ইরান নিজের মর্যাদা বিকিয়ে দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। স্বাক্ষরিত নথির ফার্সি সংস্করণের একটি ছবিসহ সামাজিক মাধ্যম এঙ–এ এসব কথা লিখেছেন তিনি। যেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন যে, এই লেখাগুলো এমন একটি জাতির কণ্ঠস্বরের প্রতিফলন, যারা কোনো হুমকি বা চাপের কাছে তাদের মর্যাদা এবং স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয়নি। খবর বিবিসি বাংলা ও বিডিনিউজের।
রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প জি৭ সম্মেলনে যোগ দিয়ে অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে এখন ফ্রান্সে আছেন। চুক্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে আক্রমণ করার পেছনে তার দেওয়া অন্তত একটি যুক্তি প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র না থাকাটা অন্যায্য হবে। অথচ আগে ইরানের এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিহ্ন করার প্রত্যয় জানিয়েছিলেন তিনি। এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানকে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, তারা যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে আমরা ওদের ওপর বোমা মেরে সব ধ্বংস করে দেবো। আমি চাই না তারা তা (করুক)। আমি চাই তারা চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাক। এ সময় তিনি ইরানিদের স্মার্ট মানুষ বলে অভিহিত করেন। দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে যে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছেন, যেহেতু চুক্তিটি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর হয়ে গেছে তাই সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে কোনো স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে না। তবে এর পরবর্তী ৬০ দিনে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছতে আলোচনা শুরু করবেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি আনবে আর তেলের দাম কমাবে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, যদি আমি এটি (চুক্তি) পছন্দ না করি, তারা যদি ভালো আচরণ না করে, আমরা গিয়ে ঠিক তাদের মাথার মাঝখানে বোমা ফেলবো, ঠিক আছে?
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানি নেতারা মুহূর্তটি উদযাপন করার সময় ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি নিয়ে কিছু বলেননি। তারা চুক্তির ছবি প্রকাশ করেছেন। এই চুক্তিকে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ বলেন, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি, এ নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না।
ইসরায়েলকেও এই শান্তি প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে : ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে– তবে তাদেরকেও অন্য সবার মতোই এই শান্তি প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের মনোভাব সম্পর্কে ভ্যান্স বলেন, আমরা মনে হয় একটি চুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে আছি, আর ঠিক তখনই বৈরুতের কোনো বেসামরিক জনবহুল এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
ভ্যান্স বলেন, তিনি ইসরায়েলের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় এবং এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো চান, যা হিজবুল্লাহর কাছে অর্থ পৌঁছানো বন্ধ করতে পারে। এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পই পুরো বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি এই মুহূর্তে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল, বলেও সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ইরানকে চাপে রাখবে যুক্তরাষ্ট্র : মৌলিক আচরণে পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ভবিষ্যতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে কী বাধা দেবে– সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে, তাই পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে ইরানের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি অর্থনৈতিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে রেখেছে এবং যতক্ষণ না তারা তাদের আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আনছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই চাপ শিথিল করব না, বলেন তিনি। ভ্যান্স বলেন যে, আচরণ পরিবর্তনের অর্থ হলো, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা। ইরান যদি তাদের আচরণ পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে পারে এবং তা যদি যাচাইযোগ্য হয়, কেবল তখনই তারা বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে, বলেও মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসেডিন্ট।
চাপের কাছে মর্যাদা বিকিয়ে দেয়নি ইরান : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে ইরান নিজের মর্যাদা বিকিয়ে দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। স্বাক্ষরিত নথির ফার্সি সংস্করণের একটি ছবিসহ সামাজিক মাধ্যম এঙ–এ এসব কথা লিখেছেন তিনি। যেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন যে, এই লেখাগুলো এমন একটি জাতির কণ্ঠস্বরের প্রতিফলন, যারা কোনো হুমকি বা চাপের কাছে তাদের মর্যাদা এবং স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয়নি। তিনি বলেন, আজ যা নথিবদ্ধ হলো, তা জাতীয় সহনশীলতা, রাজনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দায়িত্বশীল কূটনীতির ফসল।












