জীবনের শেষ সময়ে এসে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান ও স্বীকৃতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করার অনেক আশা ছিল পটিয়ার অকুতোভয় রণাঙ্গনের যোদ্ধা রফিক আহমদের। সে প্রত্যাশা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলসহ (জামুকা) সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফাইল নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছেন বছরের পর বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি তার মেলেনি। এই আক্ষেপ নিয়ে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর প্রায় ৭৯ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।
মুক্তিযোদ্ধা রফিক আহমদের ৭০ বছর বয়সী স্ত্রী সামশুন নাহার বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু মিলেনি। সেই আক্ষেপ নিয়ে তিনি গত বছর মারা যান। এখন তার নিজের শরীরেও নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। এখন অন্তত একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে সম্মান লাভের আশা তার। রফিক আহমদের দুই সন্তান মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এরশাদ ও ফাতেমা বেগমেরও একই প্রত্যাশা– তারা যেন একজন দেশপ্রেমিক ও জাতির শ্রেষ্ট সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সরকারি স্বীকৃতিটুকু লাভ করেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফজল আহমদ চৌধুরী জানান, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা রফিক আহমদ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন লড়াকু সৈনিক ছিলেন। তা বিভিন্ন সাক্ষী প্রমাণে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তার গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন শহীদ অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী। যিনি পাক–হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাহাড়তলী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান চুয়েট) এলাকায় শহীদ হন। সেদিন রফিক আহমদ ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। পরবর্তীতে তিনি পটিয়ার ৭ নম্বর বিএলএফ গ্রুপ কমান্ডার নুরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে ও গ্রুপ কমান্ডার এ এফ এম তোজাম্মেল হোসেনের গ্রুপে সম্পৃক্ত মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। বতর্মানে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের যাচাই–বাছাই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা রফিক ৭৫ নম্বর তালিকায় রয়েছেন বলে জানা যায়। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেট অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানিয়ে গত ২০২২ সালে মুক্তিযোদ্ধা রফিক আহমদের পুত্র মো. মোজাম্মেল হক এরশাদ পটিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে সেটি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে নথিভুক্ত করা হয় এবং এর ডকেট নং ৬৯৮।
পটিয়ার কোলাগাঁও ইউনিয়নের নলান্দা গ্রামের কৃতী সন্তান রফিক আহমদ ছিলেন সেই সাহসী প্রজন্মের একজন, তরুণ বয়সে দেশমাতৃকার টানে তিনি ঘর ছেড়ে রণাঙ্গনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে অধ্যাপক দিলীপ কুমার চৌধুরীর নেতৃত্বে তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে কাপ্তাই–পদুয়া হয়ে দোভাষী বাজারে পৌঁছান। পরবর্তীতে শত্রুপক্ষের আক্রমণে অধ্যাপক দিলীপ কুমার চৌধুরীসহ কয়েকজন সহযোদ্ধা শহীদ হন। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরে তিনি আবারও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। পটিয়ার পূর্ব পাহাড়ে খুরুশিয়ার বাঘাইয়া চাকমার খামারবাড়িতে লাঠি আলম ও হাবিলদার ইছহাকের অধীনে অস্ত্র চালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতের মিজোরামের দেমাগ্রী ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। গ্রামীণ মেঠোপথ, দুর্গম পাহাড়, অর্ধাহারে–অনাহারে কখনো জীবন বাঁচাতে ছদ্মবেশে সবকিছু পেরিয়ে তিনি স্বাধীনতার স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যান।
স্বাধীনতার পরও তার জীবন থেমে থাকেনি। ১৯৭৩ সালে সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটান। নীরবে নিজের জীবনসংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। কখনো নিজের মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে সামনে এনে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় তার একটি বড় আক্ষেপ থেকে যায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি সেই স্বীকৃতির আশায় আবেদন করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তার স্বীকৃতির আবেদন পৌঁছেছে। কিন্তু জীবদ্দশায় কাক্সিক্ষত স্বীকৃতিটি আর তার হাতে ওঠেনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আহমদ ১৯৪৭ সালের ৭ আগস্ট পটিয়ার কোলাগাঁও ইউনিয়নের নলান্ধা গ্রামের মুন্সি মিয়াজীর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী রফিক আহমদ ১৯৬৫ সালে চরকানাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাসের পর চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে ভর্তি হন। পরে বোয়ালখালীর স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। ৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রিতে অধ্যয়ন করেন। সেই সময়টি ছিল আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়। রফিক আহমদ তখন বাম ধারার ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী। ১৯৬৯ এর ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনে পটিয়া ও বোয়ালখালী অঞ্চলে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল কিংবদন্তীতুল্য।
রফিক আহমদের পুত্র মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এরশাদ জানান, চলতি বছরের গত জুন মাসে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) গিয়েছিলাম। যাচাই–বাছাই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও এখনো মন্ত্রণালয়ের গেজেট শাখায় আনেনি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত সন্তান হিসেবে এ স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে আমার পরিবার।










