মাত্র একদিন পরেই বিয়ের ফর্দ হবার কথা ছিল আহমদের। সব কথাই পাকা শুক্রবারে ফর্দ হলেই পরের দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে। বিয়ের সেই সানাই আর বাজলো না। হলো না মেহেদী, তার আগেই গলা কাটা রক্ত মাখা গায়ে পরপারে চলে গেলেন বাবা -মার প্রিয় মেঝ ছেলে আহমদ। সংসারের প্রায় সবটুকু বোঝা টানতেন তিনি। ছোট ভাইটিও আগে বিয়ে করেছে। তবুও পরিবারের মেঝ ছেলে আহমদের কোনো অভিযোগ ছিল না। হাসিমুখে সংসার চালাতেন নিজে। এতেই কাল হলো। মেঝ ছেলের প্রতি ভালবাসা দেখাতে গিয়ে বাবা তাকে কিছু জমিও বেশি দিয়েছিলেন এমন কথা লোক মুখে শুনে ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন বড় ছেলে সাদেক। তার পরিণতিতে বাবা-মা আর মেঝ ভাইকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক সাক্ষ্য প্রমাণ আর সুরতহালেও জায়গা-সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে এক পরিবারে তিনজন খুনের এ ঘটনা ঘটেছে বলছে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ। বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাপাহাড় গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ, পিবিআই চট্টগ্রাম ও সিআইডি যৌথ ও পৃথকভাবে ঘটনার রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নিহতরা হলেন, মুদি দোকানদার মোস্তফা (৫৮), তার স্ত্রী জ্যোৎস্না বেগম (৫০) ও ছেলে আহমদ হোসেন (২৬)। ঘটনায় নিহত মুদি দোকানি মোস্তফার ছোট ছেলে আলতাফ হোসেন (২৪) বারইয়াহাট বাজারে মাছের আড়তে চাকরি করেন।
ঘটনার পর উপস্থিত হওয়া আলতাফ জানান, রাত ৩টার দিকে প্রথমে এক মহিলা ও পরে ঘরে থাকা আমার বড় ভাই সাদেক (২৮) আমাকে ফোন করে বলেন ঘরে ডাকাত ঢুকে বাবা-মা আর আমার ভাইকে কুপিয়েছে। তাদের হাসপাতালে নিতে আমাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেন। আমি যতোটা সম্ভব ৪টা নাগাদ এসে দেখি বাবা-মা-ভাই ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। তখন আমার ভাই আর ভাবীকে অক্ষত অবস্থায় দেখি। ঘরের আসবাবপত্র, দরজা-জানালা সব ঠিক আছে। বাকিটা আল্লাহই ভাল জানেন। মেঝ ভাইকে কিছু সম্পত্তি লিখে দেয়া নিয়ে বড় ভাই সাদেকের সাথে ঝগড়া হয়েছিল বলেও জানান আলতাফ। ছোট ভাই আলতাফ নিহত মেঝ ভাই আহমদ হোসেন বিয়ে করার আগে বড় ভাইয়ের শ্যালিকাকে বিয়ে করেন। তবে মেঝ ভাই আহমদের বিয়ের কথাও ইতিমধ্যে পাকা হয়েছিল। শুক্রবার ফর্দ হবার কথাও হয়েছে। ঘটনা শুনে স্বামীর বাড়ি থেকে ছুটে আসা মোস্তফা ও জ্যোৎস্না বেগমের একমাত্র কন্যা জুলেখা আক্তারও (২২) বলেন, ‘আমার ভাই সাদেক আর ভাবী আইনুর নাহার মিলেই বাবা-মাকে খুন করেছেন। আমি এদের বিচার চাই।’ কন্যা জুলেখা আরো বলেন, কদিন আগেও ভাই-ভাবী বাবা-মায়ের সাথে এসব নিয়ে শুধু ঝগড়া করতেন। মা তাদের পৃথক করে দেয়ার কথা বললেও বাবা তা করতে নিষেধ করেছিলেন। ৪ শতক জমি মেঝ ছেলেকে বেশি দিয়েছিলেন বলে সেই ঘটনার জের ধরে এমন নৃশংস কাণ্ড।
এদিকে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ সকালেই নিহতের পুত্র সাদেককে (২৮) আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এছাড়া সাদেকের স্ত্রী আইনুর নাহারসহ সবাইকে পুলিশ ঘটনার তদন্তের জন্য বাড়িতেই নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এইদিকে চট্টগ্রাম থেকে আসা সিআইডি টিম, পিআইবির কর্মকর্তারা ঘটনার সুরতহাল প্রতিবেদন করেন। পিআইবির পরিদর্শক মনির হোসেন বলেন, আমরা সকাল থেকে সিআইডি টিমের অপেক্ষায় ছিলাম। নিহতের অপর সন্তানদের বক্তব্যেই অনেক কিছু আমরা বুঝতে পারছি। বাকিটুকু সাক্ষ্য প্রমাণের উপর নির্ভর করছে। এই বিষয়ে জোরারগঞ্জ থানার ওসি নুর হোসেন মামুন বলেন, সকলেই সরেজমিনে পুরো ঘটনা দেখলেই হয়তো অনেকটাই বুঝতে পারবে এখানে আসলে কি ঘটেছিল। আর কেন ঘটেছিল তা পরিবারের সদস্যরা সত্যি কথা বললেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ওসি তদন্ত হেলাল উদ্দিন ফারুকী বলেন,‘সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক কলহের জের ধরেই এই খুন। বাড়ির গেট, দরজা, জানালা অক্ষত। ভেতরের কিছুই খোয়া যায়নি। এমনকি ব্যবসার টাকাগুলোও কেউ নিয়ে যায় নি। খুনের পূর্বে ভেতর থেকেই সব বন্ধ ছিল। তবুও পুরো ঘটনার তদন্ত শেষে সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান জোরারগঞ্জ থানার ওসি নুর হোসেন মামুন।












