মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রে মহাজাগতিক গ্যাসের বিশাল জাল

| রবিবার , ১ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ

মহাকাশ বিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর ছায়াপথ মিল্কি ওয়ের একেবারে কেন্দ্রে ছড়িয়ে থাকা বিশাল এক মহাজাগতিক গ্যাসীয় জালের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ও বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির দাবি তাদের। এ মানচিত্রে দেখা গেছে, মহাকাশে সুতার মতো সরু কিছু কাঠামো প্রবাহিত হচ্ছে, যা দেখতে অনেকটা মহাকাশে বয়ে চলা বস্তুর নদীর মতো। এসব ‘নদী’ মাঝেমধ্যে এক জায়গায় মিলিত হয়ে এমন উজ্জ্বল মেঘ তৈরি করে, যেখানে নতুন নতুন তারা জন্ম নেয়।

চিলিতে অবস্থিত আলমা টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গবেষকরা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের গতিপ্রকৃতি ও রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করেছেন। এ অঞ্চলটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও শক্তিতে ভরপুর, যা নতুন তারা তৈরির কাঁচামালের এক বিশাল ভান্ডার হিসেবে কাজ করে। এ অঞ্চলে গ্যাস ও ধূলিকণার ঘন মেঘ রয়েছে, যেখানে হাইড্রোজেনের আধিক্য বেশি। তবে এর পাশাপাশি সামান্য পরিমাণে হিলিয়াম ও অন্যান্য উপাদানও আছে। এখানকার তাপমাত্রা প্রচণ্ড শীতল, যা ‘পরম শূন্য’ তাপমাত্রার সামান্য উপরে। এসব গ্যাস ও ধূলিকণা মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নিজেদের উপর ভেঙে পড়ে বা সংকুচিত হয় তখনই নতুন তারা জন্ম নেয়। খবর বিডিনিউজের।

মিল্কি ওয়ের ঠিক মাঝখানে ‘স্যাজিটেরিয়াস এ’ নামের বিশাল এক ব্ল্যাক হোল রয়েছে। আলমা টেলিস্কোপের মাধ্যমে ছায়াপথের কেন্দ্রের প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা গেছে। এক আলোকবর্ষ এক বছরে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের সমান, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।

এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য, ছায়াপথের কেন্দ্রের মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে গ্যাস জমাট বেঁধে তারায় পরিণত হয় তা খতিয়ে দেখা। জার্মানির ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক অ্যাশলি বার্নস বলেছেন, এই প্রথম আমরা সম্পূর্ণ অঞ্চলজুড়ে থাকা গ্যাসগুলোকে স্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছি। ফলে বিশাল এলাকাজুড়ে গ্যাসের প্রবাহের সঙ্গে তারা তৈরি হওয়া ঘন মেঘের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। একইসঙ্গে তারার বিস্ফোরণ ও বিকিরণ কীভাবে এই পরিবেশকে নতুন রূপ দিচ্ছে তাও আমরা দেখছি।

গবেষণাটি মান্থলি নোটিশেস অফ দ্য রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি জার্নালে ছয়টি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে। সেন্ট্রাল মলিকিউলার জোন নামের এ অঞ্চলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। মানচিত্রে দেখানো এ এলাকাটি ধনু রাশির দিকে অবস্থিত, যা পৃথিবী থেকে দেখলে চাঁদের প্রস্থের প্রায় তিন গুণ বড় মনে হবে। গবেষকরা আলমা টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া এ পর্যবেক্ষণের একটি ছবি প্রকাশ করেছেন।

অ্যাশলি বার্নস বলেছেন, এ ছবিতে দেখানো শীতল গ্যাস খালি চোখে দেখা না গেলেও আমরা যখন বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতকে আলাদা আলাদা রং দিয়ে চিহ্নিত করি তখন এক অসাধারণ ও জটিল দৃশ্য ফুটে ওঠে। আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের গঠনকে এত বিস্তারিতভাবে দেখা সত্যিই এক অপার সৌন্দর্য। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এই সুতার মতো সূক্ষ্ম কাঠামো আসলে একেকটি বিশাল অবয়ব, যার প্রতিটি দশ আলোকবর্ষজুড়ে বিস্তৃত।

গ্যাসের এসব কাঠামো ছাড়াও ছবিতে বড় বড় গহ্বর এবং বুদবুদের মতো কাঠামো দেখা গেছে। এ বিশাল এলাকাজুড়ে থাকা বড় সব তারার শক্তিশালী হাওয়া ও সুপারনোভা বা তারার শক্তিশালী বিস্ফোরণ এসব অদ্ভুত কাঠামো তৈরি করেছে। তবে এই অঞ্চলে তারা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষ এক অসংগতি বা রহস্য লক্ষ্য করেছেন গবেষকরা।

লিভারপুল জন মুরেজ ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং এ গবেষণার আরেকজন প্রধান গবেষক স্টিভেন লংমোর বলেছেন, বিপুল পরিমাণ গ্যাস থাকার পরও এখানে আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক কম তারা তৈরি হচ্ছে, যা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় এক রহস্য। বর্তমান এই প্রকল্পটি এ রহস্য সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করছে।

মিল্কি ওয়ের যে শান্ত সর্পিল বাহুতে অবস্থিত আমাদের সূর্য, এর তুলনায় ছায়াপথের কেন্দ্রের পরিস্থিতি একদম আলাদা। কেন্দ্রের এ অশান্ত গতিপ্রকৃতি তারা তৈরির প্রক্রিয়াতে বাধা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। গবেষক লংমোর বলেছেন, এখানকার চাপ সাধারণ এলাকার তুলনায় বহুগুণ বেশি ও বিভিন্ন চৌম্বকক্ষেত্রও অনেক বেশি শক্তিশালী। এ অঞ্চলটি মহাজাগতিক রশ্মি এবং কেন্দ্রে থাকা বিশাল ব্ল্যাক হোল ও সেখানকার শক্তিশালী তরুণ তারাগুলোর বিকিরণে সিক্ত। এখানকার অস্থিরতা বা আলোড়ন অকল্পনীয়। এসব গ্যাস শব্দের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি গতিতে ছুটে চলছে, গ্যাসের মেঘগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে এবং ব্ল্যাক হোল ও আশপাশের বিভিন্ন তারার মহাকর্ষীয় বল প্রতিনিয়ত এসব গ্যাসকে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে বা লম্বা করে দিচ্ছে।

ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা ‘স্যাজিটেরিয়াস এ’ ব্ল্যাক হোলটির ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪০ লাখ গুণ। গবেষকরা এ অঞ্চলের জটিল রাসায়নিক মানচিত্রও তৈরি করেছেন, যেখানে সিলিকন মনোঅঙাইড মিলেছে। যখন গ্যাসের বিভিন্ন মেঘ শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে একে অপরের সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায় তখন তৈরি হওয়া শক্তিশালী শকওয়েভ থেকে এ রাসায়নিক উপাদানটি তৈরি হয়। এখানে মিথানল, ইথানল ও অ্যাসিটোনের মতো জটিল জৈব অণুরও সন্ধান মিলেছে।

লংমোর বলেন, এসব অণুর উপস্থিতি বিশেষভাবে রোমাঞ্চকর। কারণ এদের মধ্যে কিছু অণুকে অ্যামিনো অ্যাসিড ও প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদানের পূর্বসূরী হিসেবে ধরা হয়। ছায়াপথের কেন্দ্রে এত বিপুল পরিমাণে এসব অণুর সন্ধান পাওয়া আমাদের ইঙ্গিত দেয়, এমন চরম প্রতিকূল পরিবেশেও শেষ পর্যন্ত প্রাণ তৈরিতে ভূমিকা রাখার মতো জটিল রসায়ন ভালোভাবেই টিকে রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচন্দনাইশে বাস চাপায় বাইক আরোহী নিহত
পরবর্তী নিবন্ধসাগরিকায় যুবক খুনের মামলার আসামি গাইবান্ধায় গ্রেপ্তার