আগের দিন চ্যালেঞ্জ দিলেন সালমান আলি আগা, আর আড়াইশ ছাড়ানো লক্ষ্য দিয়ে শেষ দিনের প্রথম সেশনে ইনিংস ঘোষণা করে দিল বাংলাদেশ। এমন সাহসী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে বিরলই বলা যায়। সেই পথে হেঁটেই কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছাতে পেরেছে দল, বললেন স্বাগতিক অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে গতকাল মঙ্গলবার ১০৪ রানে জিতে দুই ম্যাচের সিরিজে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২৬৮ রানের লক্ষ্য দিয়ে, নাহিদ রানার ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে সফরকারীদের ১৬৩ রানে গুটিয়ে স্মরণীয় জয়ের উল্লাসে মাতেন শান্ত–মুমিনুল–মুশফিকরা।
চতুর্থ দিনের খেলা শেষে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান সালমান বলেছিলেন, ইনিংস ঘোষণা করার ‘সাহস করবে না’ বাংলাদেশ। আর যদি ২৭০ রানের মতো লক্ষ্য দিয়ে প্রথম সেশনে ইনিংস ঘোষণা করে দেয় শান্তর দল, তাহলে পাকিস্তানও জয়ের জন্য ব্যাটিং করবে। যদিও ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে শান্ত বললেন, সালমানের ওই চ্যালেঞ্জের কথা জানতেন না তিনি। জয়ের লক্ষ্যেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তে ইনিংস ঘোষণার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।
এই প্রথম পাকিস্তানকে রানের ব্যবধানে হারালো টাইগাররা। পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ জয়ের স্বাদও পায় স্বাগতিক বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে টেস্টে এই নিয়ে তৃতীয়বার পাকিস্তানকে হারালো বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে পাকিস্তান সফরে দুই টেস্ট যথাক্রমে ১০ ও ৬ উইকেটে জিতেছিল টাইগাররা। এমন অর্জন প্রথমবারের মতো লাভ করলো তারা।
এদিকে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চতুর্থ চক্রে প্রথম জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। ৩ ম্যাচে ১টি করে জয়–হার ও ড্রতে ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের ষষ্ঠ স্থানে উঠল বাংলাদেশ। ৩ ম্যাচে ১ জয়, ২ হারে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের সপ্তম স্থানে নেমে গেল পাকিস্তান।
বৃষ্টিবিঘ্নিত চতুর্থ দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ১৫২ রান। ৭ উইকেট হাতে নিয়ে মোট ১৭৯ রানে এগিয়ে ছিল টাইগাররা। নাজমুল হোসেন শান্ত ৫৮ ও মুশফিকুর রহিম ১৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। পঞ্চম দিনের ১১তম বলে সাজঘরে ফেরেন মুশফিক (২২)। দলের রান ২০০ পার হওয়ার আগে সাজঘরে ফেরেন লিটন দাসও (১১)।
১৯০ রানে পঞ্চম উইকেট পতনের পর শান্ত ও মেহেদি হাসান মিরাজের ২৬ রানের জুটিতে ২০০ স্পর্শ করে বাংলাদেশ। দলীয় ২১৬ রানে স্পিনার নোমান আলির বলে লেগ বিফোর হয়ে আউট হন শান্ত। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়ে ৮৭ রানে আউট হওয়ার আগে ১৫০ বল খেলে ৭টি চার মারেন টাইগার অধিনায়ক। শান্ত ফেরার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি ওয়ানডে মেজাজে খেলা মিরাজ। ৩ চার ও ১ ছক্কায় ২৭ বলে ২৪ রান করেন তিনি। দলীয় ২২৫ রানে সপ্তম ব্যাটার হিসেবে মিরাজ ফেরার পর বেশি দূর যায়নি বাংলাদেশ।
৯ উইকেটে ২৪০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে দেয় টাইগাররা। এতে জয়ের জন্য ৭৫ ওভারে ২৬৮ রানের টার্গেট পায় পাকিস্তান। তাইজুল ইসলাম (৩) ও তাসকিন আহমেদ ১১ রানে আউট হলেও ৪ রানে অপরাজিত থাকেন এবাদত হোসেন। পাকিস্তানের হাসান ও নোমান ৩টি করে উইকেট নেন।
জয়ের জন্য ২৬৮ রান তাড়া করতে নেমে প্রথম ওভারের শেষ বলে উইকেট হারায় পাকিস্তান। বাংলাদেশ পেসার তাসকিন আহমেদের বলে উইকেটরক্ষক লিটন দাসকে ক্যাচ দেন ওপেনার ইমাম উল হক। এরপর ৫৪ রানের জুটি গড়েন আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফজল। ১৩তম ওভারের প্রথম বলে আজানকে (১৫) বোল্ড করে বাংলাদেশকে ব্রেক–থ্রু এনে দেন স্পিনার মিরাজ। ক্রিজে আসা নতুন ব্যাটার পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদকে ২ রানে শিকার করেন নাহিদ রানা। এতে ৬৮ রানে ৩ উইকেটে পরিণত হয় পাকিস্তান। এ অবস্থায় চতুর্থ উইকেটে ৫৪ রানে জুটি গড়েন ফজল ও সালমান আগা।
চা–বিরতির পর পাকিস্তানের দুই সেট ব্যাটারের বিদায় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ১১টি চারে ৬৬ রান করা ফজলকে আউট করেন বাংলাদেশ স্পিনার তাইজুল ইসলাম। আরেক সেট ব্যাটার সালমানকে ২৬ রানে শিকার করেন তাসকিন। ১২১ রানে পঞ্চম উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে সফরকারীরা। ষষ্ঠ উইকেটে জুটি গড়ার চেষ্টা করেন সৌদ শাকিল ও মোহাম্মদ রিজওয়ান। জুটিতে ৩১ রান যোগ করে বাংলাদেশকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন তারা।
দলীয় ১৫২ রানে শাকিলকে (১৫) থামিয়ে জুটি ভাঙেন নাহিদ। শাকিলের আউটের পর নাহিদের পেস তোপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পাকিস্তান। ১৬৩ রানে অলআউট হয় তারা। ১১ রানে শেষ ৫ উইকেট হারায় পাকিস্তান। এরমধ্যে ৪ উইকেট নেন নাহিদ। এই ইনিংসে ৯.৫ ওভার বল করে ৪০ রানে ৫ উইকেট নেন নাহিদ। এটিই তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার। এর আগে একবার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে। এছাড়া তাসকিন ও তাইজুল ২টি করে এবং মিরাজ ১ উইকেট নেন।
প্রথম ইনিংসে ১০১ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭ রান করে ম্যাচ সেরার স্বীকৃতি পান অধিনায়ক শান্ত। আগামী ১৬ মে থেকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ–পাকিস্তান।













