মহাশিশুর জন্মদিনে হৃদয়ের অর্ঘ্য

আবদুচ ছালাম | বৃহস্পতিবার , ১৭ মার্চ, ২০২২ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ


মার্চ মাসের সতের তারিখ। এক মহাশিশুর জন্ম নিয়েছিলেন সেদিন দুঃখিনী বাংলায়। গোপালগঞ্জের মধুমতি বিধৌত টুঙ্গিপাড়ার সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক মুসলিম পরিবারের শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সাহারা খাতুনের কোল আলোকিত করা সেই শিশুটি আসবে বলে নতুন পত্রপল্লব, ফুলের সৌরভে সেজেছিল বাংলার প্রকৃতি। বাংলার ধুলা, মাটি, কাদায় মাখামাখি হয়ে বাড়তে থাকা শেখ বাড়ির খোকা যে কেবল টুঙ্গিপাড়ার নয় বিশ্বের অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনতার তারই ইঙ্গিত যেন দিয়েই রেখেছিলেন খোকা। শৈশবেই খোকার চলন, বলন ও আচরনে অসাধারণত্বের প্রকাশ পায়। বন্ধুরা সহজেই তার প্রতি মুগ্ধ হতেন। বিদ্যালয়ের ক্লাস কিংবা পাড়ার ফুটবল টিম, সবখানেই অধিনায়কত্ব ছিল খোকার। রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল তাঁর অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বক্তৃতা, আলোচনায় সকলের মনে প্রভাব ফেলতে পারতেন তিনি। টুঙ্গিপাড়ার মাঠের কোনার আমগাছের নিচেই চলত খোকার সমাজ ও রাজনৈতিক চর্চার প্রারম্ভিক স্থল। যে কোন সংকট কিংবা সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণে এখানে বসেই তিনি বন্ধুদের সাথে আলোচনা কিংবা দাঁড়িয়ে বক্তৃতা রাখতেন। খোকার পুরো নাম ছিল শেখ মুজিবর রহমান। শেখ মুজিব যখন গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুলে পড়ছিলেন, স্কুল পরিদর্শনে আসেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলের ছাদ দিয়ে পানি পড়া বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ব্যবস্থা ও ছাত্রাবাস নির্মানের দাবি উত্থাপন করে মুজিব স্কুল ছাত্রদের উপযুক্ত প্রতিনিধির কাজ করেছিলেন।
মুক্তির আলো যিনি; সেই মহাশিশুটি যতই বেড়ে উঠতে লাগলেন, কৈশোর ও যৌবন পেরিয়ে মহাশিশুটি হয়ে ওঠেন মহামানব। দীপ্তিময়তা তাঁর ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র; আলোর পথের দিশা পেল যেন-দুঃখিনী বাংলার শোষিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনতা। এ আলো ছড়াতে গিয়ে, আলোর প্রখরতা বাড়াতে বাংলার মুক্তির মশাল মুজিব নিজেকে বারে বারে জ্বলতে হয়েছে শোষক ও শাসক শ্রেণীর তীব্র রোষানলে। দেশমাতা ও তার সন্তানদের ভালবেসে তারুণ্যের সন্ধিতেই সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন শেখ মুজিবর। বয়সটা যখন কুড়ি, ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগেরও কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নেতৃত্বে দ্যুতি ছড়ায়ে নিজেকে প্রমান করেছিলেন শেখ মুজিবর রহমান।
১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন তিনি। দেশ বিভাগের পর, ১৯৪৭ স লে কোলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রতিরোধে শেখ মুজিবের ব্যাপক তৎপরতাপূর্ণ চৌকস ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সময় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ২৩ ফেব্রুয়ারী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন পশ্চিমাদের লেজুড়বৃত্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আইন পরিষদে উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয়ার কথা জানালে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১১মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে ধর্মঘট পালনকালে সহকর্মীদের সাথে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে গ্রেফতার হন তিনি। ১৫মার্চ মুক্তি পেলেও ফরিদপুর কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ১১ সেপ্টেবর পুনরায় কারাবরণ করতে হয় বাংলার মুজিবকে। ১৯৪৯সালের ২১ জানুয়ারি কারামুক্তি পাওয়ার পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে পালিত ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানানোর কারণে ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মুজিবকে জরিমানা করে। অযৌক্তিক এ জরিমানার নির্দেশ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত করে তাবেদার কর্তৃপক্ষ। এবং ১৯ এপ্রিল উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে তিনি আবারো গ্রেপ্তার হন। জেলে থাকা অবস্থায় ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে, শেখ মুজিবুর রহমানকে এ দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। জুলাই মাসের শেষের দিকে জেল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে বিরাজমান খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে আবারো গ্রেপ্তার হন তিনি-এ যেন শোষকের কোপানলে পুড়ে শোষকের বিরুদ্ধে দোর্দন্ড প্রতাপ আর শোষিত, বঞ্চিতদের জন্য উজ্বল দীপ্তির অনির্বাণ শিখা হয়ে ওঠা।
১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। এর প্রতিবাদে বন্দি থাকা অবস্থায় ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে অনশন শুরু করেন শেখ মুজিব। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অনুষ্ঠিত ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর শহীদ হলে ক্ষুব্দ হয়ে তিনি জেলখানা থেকে এক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং একটানা ১৭ দিন অনশন অব্যাহত রাখেন।
১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে শেখ মুজিবর রহমানকে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এরপর ৫৪’র নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া, প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব লাভ, গ্রেফতার, লড়াই-সংগ্রাম, ৬৬’র ৬দফা দাবী পেশ করার মধ্য দিয়ে সারা বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। হয়ে ওঠেন, বাংলার জনসাধারনের প্রাণের মুজিব ভাই। সংগ্রামরত ছাত্র জনতা তাঁকে উপাধি দেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুপত্নী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের কথা এখানে উল্লেখ করতেই হয়। পরিবারের একান্ত ইচ্ছায় ১৯৩৮ সালে অর্থাৎ তুলনামূলক কম বয়সেই বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে শেখ মুজিবের বিয়ে হয়। রাজনীতির কারণে বার বার বন্দী জীবনে থাকা, বেশীর ভাগ সময়েই দলের নেতাকর্মীদের সাথে সময় কাটানো, নানা সময়ে দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফরের কারণে পরিবারকে খুব বেশী সময় বঙ্গবন্ধু কখনোই দিতে পারেননি। এ নিয়ে মুজিবপত্মীর কষ্ট থাকলেও অভিযোগ কখনোই ছিলনা। হয়তো তিনি বুঝেছিলেন বাংলার দুখী মানুষের ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি স্বামী মুজিবের হাত ধরেই আসবে। খুবই কম হলেও যে টুকু সময় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে থাকতেন ঐটুকুতেই ভরিয়ে তুলতে পারতেন সকল না পাওয়া। পরিবারের সাথে কাটানো খুব সামান্য সময়েও পরিবারের সকলকেই তাঁর আদর্শের প্রতি অনুরক্ত করতে পেরেছিলেন তিনি। বোঝাতে পেরেছিলেন তিনি কি চান, দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে তাঁর অনুরাগ, ভাবনা ও পরিকল্পনা কি। তাই তিনি তাঁর সন্তানদের সকলকেই দেশপ্রেমিক, সংস্কৃতিমনা ও সৃজনশীলতার উৎকর্ষে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। তাই তিনি ছিলেন পারিবারিকভাবে একজন সফল পিতা। সারা দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসা, অনুরাগ, অনুভুতি ও দায়িত্ব বোধ মুজিবকে করেছিল বাঙালি জাতির নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।
বাংলা ও বাংলার মানুষের স্বার্থে ২৩বছরের দীর্ঘ ত্যাগময় সংগ্রামের পথ ধরে তিনি এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ এক মুক্তিপাগল জাতিতে পরিণত করতে পেরেছিলেন। ১৯৬৯এ পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করেন। ১৯৭১এর ৭মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন শোনার জন্য সমগ্র বাংলার রাজপথ এসে মিশেছিল রমনার রেসকোর্স ময়দানে। সেদিনের বঙ্গবন্ধুর ভাষন আজো প্রতিধ্বনিত হয় কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে। কুটনৈতিক বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ভাষনটি ছিল অত্যন্ত উচ্চ মার্গের। এ ভাষণ বাংলার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুুত করে তুলেছিল, বাঙালি পেয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিকল্পনা। ২৫মার্চ দিবাগত রাতে পাক হানাদারেরা নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর হামলে পড়লে বঙ্গবন্ধু ঐ রাতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন এবং বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য বাংলার মানুষকে আহ্বান করেন। এরপর পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে করাচী নিয়ে গেলেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান হতে অমিত সাহস ও প্রেরণা নিয়ে দীর্ঘ নয়মাস মরণপণ যুদ্ধ করে গৌরবময় বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হয় বাঙালি।
১৯২০সালের ১৭মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়েছিল যে মহাশিশু এভাবে তিনি হয়ে ওঠেন এক মহাপিতা, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। জাতির জনকের এ শুভ জন্মলগ্নে তাঁর প্রতি রইল আমার হৃদয়ের অর্ঘ্য, বিনম্র শ্রদ্ধা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু শেখ হাসিনা।
লেখক: রাজনীতিবিদ ও উন্নয়ন সংগঠক, কোষাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ, সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাল আজকাল
পরবর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে চোরাই মোটরসাইকেলসহ আটক দুই