বয়োজ্যেষ্ঠদের স্থানটা বড্ড নড়বড়ে আজ

শিউলী নাথ | বৃহস্পতিবার , ১ এপ্রিল, ২০২১ at ৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ

‘গুরুজনে করো নতি’ বা বড়দের সবসময় শ্রদ্ধা করবে–এই উপদেশ বাক্যটি শৈশব থেকে শুনেই আমরা বড় হয়েছি। বয়সে যারা বড় তাদের সম্মান করেছি। তাদের মুখোমুখি হতে ভয় পেয়েছি। কদাচিৎ অন্যায় বা ভুল কিছু যদি করেই থাকি তাহলে তো আর কথাই নেই। তাদের সামনে দাঁড়াতে গিয়ে রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মুখে মনে হোত পা দুটো শিথিল হতে হতে ক্রমশ অবশ হয়ে যাচ্ছে। এরপর ভাগ্যে শাস্তি জুটেছে। কখনো বা রাগত স্বরে বলতে শুনেছি,”এই শেষবারের মতো ক্ষমা করে দিলাম”।এতকিছুর পরেও গুরুজন, শিক্ষক বা বয়সে যারা বড়, তাদের স্নেহধন্য হতে সবসময় মন চাইতো। তাদের কীভাবে খুশি করা যায় সেই চেষ্টা থাকতো প্রতিনিয়ত। স্কুলের বড় স্যার, বড় আপা,হুজুর স্যার এসব নাম শুনলে ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতে হোত।কেননা তারা স্কুলের সিনিয়র। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয় দুটোই কাজ করতো। চাকরি ক্ষেত্রেও যিনি সবচেয়ে সিনিয়র তাকে সবাই সমীহ করে কথা বলতো। কারন তিনি যে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। যে পরিবারে দাদা- দাদী থাকতেন, তাদের ডিঙিয়ে ঐ পরিবারের কেউই কথা বলতেন না। কারণ বড়জনেরা ভালো ভাবে চলার,থাকার উপদেশ দিতেন। অন্যায় থেকে বিরত হবার কথা বলতেন। অন্যরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাদের অনুসরণ করতেন। সুখে দুঃখে তাদের পরামর্শ নিতেন। তাছাড়া সমাজের সকল কাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের অগ্রাধিকার থাকতো। বলতে গেলে বিদ্যালয়, সমাজ বা পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠরা ছিলেন বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। কালের পরিক্রমায় বয়োজ্যেষ্ঠর স্থানটা যেন বড্ড নড়বড়ে হয়ে গেছে। কখনো প্রত্যক্ষ কখনো বা গণমাধ্যমের কল্যাণে এসব চিত্র দৃষ্টিগোচর হয়। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ যিনি, তিনি একপ্রকার নিঃসঙ্গভাবেই যেন পড়ে থাকেন এক কোনায়। নিজ সন্তানেরা যেন দায়সারা দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত হন।বয়স হতে হতে অভিজ্ঞতার ঝুলি যেখানে বাড়ে, সেখানে ঐ অভিজ্ঞ মানুষগুলোর গুরুত্ব কমতে থাকে। আধুনিক যুগের পৌত্র, প্রপৌত্ররা তাদের ‘ব্যাক ডেটেড’ বলেই জাহির করে। চাকুরী বা সমাজ জীবনেও তাদের মূল্য কমতে থাকে।পুরানো ধ্যান ধারণার প্রতিনিধি বলে তাদের গন্য করা হয়। বলতে গেলে অনেকটা অবহেলিত। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এক সময় ঐ বয়োজ্যেষ্ঠরাই সমাজ, সংসার সব সামলে ছিলেন। তাদের চিন্তা ভাবনা হয়তো এই ইন্টারনেটের যুগের সাথে যায়না তবু্‌ও যখন গৃহের বা সমাজের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ চিরতরে হারিয়ে যান, তখন আমরা বুঝি তার মূল্য কতো ছিলো! আমরাও একদিন ঐ সারিতেই স্থান পাবো একথা মনে রাখতে হবে।তাই গুরুজনদের প্রতি আমাদের যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। কোনো বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে বোঝাতে হবে।তারা যেন মনোকষ্টে না ভোগেন সেদিকে খেয়াল রেখে তাদের সঙ্গ দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। কবি তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন ঠিকই, সেই সাথে জীর্ণ পুরাতন মতবাদীদের ও জাগিয়ে তুলতে বলেছেন।-এখানেই হবে পরম সার্থকতা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাস্ক ব্যবহার প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধওয়াসার পানি