‘ব্রাজিল সেতু’র আয়ুষ্কাল বাড়ল

রেট্রোফিটিং পদ্ধতির ব্যবহার

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | বৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ

পর্যটন শহর রাঙামাটির অন্যতম দর্শনীয় স্থান আসামবস্তি সেতু। জেলা শহরের আসামবস্তি বাজার থেকে কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার সড়কটির শুরু আসামবস্তি সেতুর প্রান্ত থেকেই। সামপ্রতিককালে ফুটবল দল ব্রাজিলের পতাকার সঙ্গে মিল রেখে সেতুটির রঙ করায় এটি এখন ‘ব্রাজিল সেতু’ নামেই অধিক সমাদৃত। তবে প্রায় দুই দশক আগে নির্মিত এ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। পরবর্তীতে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে সেতুর আয়ুষ্কাল বাড়িয়েছে অন্তত আরও ৩০ বছর।

মূলত পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির দর্শনীয় পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোর অন্যতম একটি হয়ে উঠেছে জেলা শহরের আসামবস্তির ‘ব্রাজিলআর্জেন্টিনা সেতু’ নামক ওয়াইআকৃতির জোড়া সেতু দুটি। কয়েকবছর আগে আসামবস্তি সেতুর পাশেই আরেকটি ছোট সেতু তৈরি করা হয় পার্শ্ববর্তী পাড়ায় যাতায়াতের জন্য। সেতুটি তৈরির পর সাদাআকাশি রঙের কারণে এটিকে বলা শুরু হয় ‘আর্জেন্টিনা সেতু’। যে কারণে পরে স্থানীয় ফুটবল প্রেমীরা ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন আসামবস্তি সেতুর রঙ ব্রাজিল দলের পতাকার সাদৃশ্য করে দেওয়ায় আসামবস্তি সেতুর নামকরণ হয়ে যায় ‘ব্রাজিল সেতু’।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৬০৮ অর্থবছরের দিকে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯৪ মিটার দীর্ঘ আসামবস্তি সেতুটি নির্মিত হয়। কিন্তু সেতু নির্মাণের ১৭ বছরের মাথায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। পরবর্তীতে ২০২৪২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে জিওবি মেইনটেন্যান্স খাতের আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে সেতুর ৪২টি ভিতের রেট্রোফিটিংয়ের কাজ শুরু করে সদর উপজেলা এলজিইডি। ২০২৪২৬ এ দুইবছরে রেট্রোফিটিংয়ের কাজ ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ আগামী বছরের মার্চএপ্রিল মাসে বাকি দুটি ভিতের কাজও সম্পন্ন করা হবে বলছে এলজিইডি।

কী এই রেট্রোফিটিং : প্রকৌশল বিজ্ঞানের ভাষায় পুরনো ভবন বা যেকোনো অবকাঠামোর ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল কাঠামোর শক্তি ও ধারণসক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্রক্রিয়া হলো রেট্রোফিটিং। মূলত এই প্রকৌশল পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে নতুন করে নির্মাণ না করেই আধুনিক প্রযুক্তি এবং সংস্কার বা মেরামতের মাধ্যমে স্থায়িত্ব বা আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করা হয়। এর মাধ্যমে অবকাঠামোটি ভূমিকম্পসহনীয়, নির্মাণ ত্রুটি, বার্ধক্যজনিত ক্ষয় এড়িয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, রেট্রোফিটিং পদ্ধতিটি ব্যবহার করে বিগত দুই বছরে আসামবস্তিকাপ্তাই উপজেলা সংযোগ সেতুটির ৪২টি ভিতের মধ্যে ৪০টি ভিতে রড, ব্যবহার উপযোগী কংক্রিট ও ৬ ধরনের অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বছরের ১২ মাসের ৮ মাসই সেতুর নিচে কাপ্তাই হ্রদের পানি থাকায় বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চারমাস রেট্রোফিটিংয়ের কাজ করা যায়। রাঙামাটিতে এটিই রেট্রোফিটিংয়ের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রথম কাজ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রাঙামাটি সদর উপজেলা প্রকৌশলী প্রণব রায় চৌধুরী আজাদীকে বলেন, সাধারণত প্রায় ৩০০ মিটার সেতুটি নতুন করে নির্মাণ করতে গেলে আগেই ৩০০৩৫০ মিটার বাইপাস বা বিকল্প সড়ক নির্মাণ করতে হবে। যেহেতু এখানে সেতুর নিচের পুরো অংশটাই কাপ্তাই হ্রদ; সেক্ষেত্রে বাইপাস সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) এবং পুরো ১৮ কিলোমিটার সড়কটি এখন পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠায় সড়কটি দীর্ঘদিন বন্ধ রাখারও সুযোগ নেই। যে কারণে আমরা সেতুর ৪২ পিআর (ভিত) রেট্রোফিটিংয়ের কাজ শুরু করি ২০২৪২৫ অর্থবছরের দিকে। তবে বছরের মাত্র চার মাস কাজ করায় সুযোগ থাকায় ৯৫ শতাংশ শেষ করতেই দুই বছর লেগেছে, না হলে এক অর্থবছরে সেটি সম্ভব ছিল।

এলজিইডি রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী আহামদ শফি আজাদীকে বলেন, বর্তমান সময়ে একটি ৩০০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের জন্য কমপক্ষে ৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন। সেখানে আসামবস্তি সেতুর রেট্রোফিটিয়ের চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে রেট্রোফিটিং করায় সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি কমপক্ষে আরও ৩০ বছর আয়ুষ্কাল বাড়ল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকালুরঘাট ফেরির ইজারাদার নিয়োগের দরপত্র ওপেন
পরবর্তী নিবন্ধব্যাংকিং সেবার ওপর নতুন করে ফি আরোপ না করার আহ্বান