বঙ্গবন্ধু ও সলিল চৌধুরী

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ২১ ডিসেম্বর, ২০২০ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

২য় পর্ব
১৯৭১ সালে সলিল চৌধুরী ‘বাংলা আমার বাংলা’ শিরোনামে মান্নাদে’র কন্ঠে চারটি গণসংগীতের নতুন অ্যারেঞ্জমেন্টে একটি অ্যালবাম তৈরি করেছিলেন। এই অ্যালবামে মান্নাদের সহশিল্পী ছিলেন সবিতা চৌধুরী ও মন্টু ঘোষ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ও সহায়তায় এই অ্যালবামটি করা হয় এবং শিল্পীরা কেউই এই অ্যালবামের জন্য রয়্যালটি নেননি। গান চারটি ছিল; (১) ধন্য আমি জন্মেছি মা, (২) ও আলোর পথ যাত্রী, (৩) মানবো না এই বন্ধনে, (৪) আহ্বান শোনো আহ্বান। এই অ্যালবামের চারটি গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো।
এছাড়া কবিতা আবৃত্তির একটি অ্যালবামও নির্মাণ করেন সলিল ১৯৭১ সালে। এ অ্যালবামে তাঁর রচিত দুই পর্বের দীর্ঘকবিতা ‘আমি খালিদের মা’ দুই ভাগে আবৃত্তি করেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী কবরী। গানের ও আবৃত্তির অ্যালবাম দু’টির রয়্যালটি জমা হয় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের তহবিলে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনটি গানের আরেকটি অ্যালবাম তিনি করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে।
প্রথমটি ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হে বিধাতা তোমায় নমস্কার’। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত এ গানে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর অকুন্ঠ শ্রদ্ধা, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের তেজস্বিতা, তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল ও তাঁর কষ্টভোগের কথা অত্যন্ত দরদ দিয়ে লিখেছেন তিনি। দ্বিতীয় গান ‘ওভাইরে ভাই, ভায়ে চল ঘরে ফিইর‌্যা যাই’। নতুন স্বাধীন দেশে সবাইকে ফিরে আসার আহ্বান, যে দেশ অনেক রক্ত, সম্ভ্রম, সাহস ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পুরো প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে এই একটি গানে। তৃতীয় গানটি ‘এদেশ এদেশ আমার এদেশ’, নতুন দেশের বন্দনা ও দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে রচিত। প্রথম দু’টি গানে সলিল চৌধুরীর অসাধারণ বাণীতে লোক আঙ্গিকে মর্মস্পর্শী সুর করেছিলেন তাঁর সহকারী প্রখ্যাত সুরকার কানু ঘোষ। তৃতীয়টির কথা সুর সলিলের। শেষোক্ত গানটি ‘রক্তাক্ত বাংলা’ ছবির টাইটেল সঙ হিসেবে ব্যবহৃত। তিনটি গানেরই শিল্পী মান্না দে, শেষোক্ত গানে মান্না দে’র সহশিল্পী সবিতা চৌধুরী।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই তিনটি অ্যালবামের কোনোটিই বাংলাদেশে বহুলভাবে প্রচারিত হয়নি, যেটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। গণসংগীত হিসেবে ১৯৭১ সালের প্রথম অ্যালবামের চারটি গান অবশ্য বাংলাদেশে আলাদাভাবে জনপ্রিয়। তবে দ্বিতীয় অ্যালবাম, অর্থাৎ কবিতা আবৃত্তির অ্যালবাম ও ১৯৭২ সালে অ্যালবামটি এদেশে খুব একটা কিংবা বলা ভালো মোটেই পরিচিত নয়। অথচ দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অ্যালবাম দুটি মূলত বাংলাদেশের জন্যেই রচিত।
বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের এই সহমর্মী সহযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করেছেন। ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার সলিল চৌধুরীকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে প্রয়াত সলিল চৌধুরীর পক্ষে এ সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী সবিতা চৌধুরী।
পরিশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সলিল চৌধুরীর লেখা গানটি উল্লেখ করছি।
সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হে বিধাতা
তোমায় নমস্কার,

মুজিবর এই নামের পতাকা
উড়াইলাম এবার,
তোমায় নমস্কার।।

তোমার কন্ঠে চাষি মজুর
গাইল যে তার ভাষা।
তোমার ভাষায় বাঙালি জাত
পাইল নতুন আশা।
তুমি রাম তুমি রহিম
কোরলা একাকার,
তোমায় নমস্কার।।

নিজভূমে পরবাসী হইয়া
রইছ কত দিন।
বুকের খুনে সুরযরে আজ
করছি গো রঙিন।

তুমি কতনা যে ঐত্যাচার
সইলা মোদের তরে।
মুজিবর…
এবার মুক্ত করছি বাংলা
আসন তোমার তরে।
বুকে-বুকে পাথ্‌ছি গো মোরা
লও হে তুলে ভার,
তোমায় নমস্কার ।।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধআমাদের শিক্ষার চালচিত্র