কবির অনুভূতির অবয়বে, সংগীত মাধুর্যে ও গতির স্বাচ্ছন্দ্যে, কবি চিত্তের বেদনা ও ভাবের শৈল্পিক বোধে, স্বকীয় দুঃখ সন্তাপে, আত্মবিমুগদ্ধতায়, প্রাণ স্পন্দনে, ব্যক্তি অনুভূতিতে, দুঃখ বেদনাসিক্ত হৃদয়েই কবিতা জন্ম নেয়, সেই কবিতা কবির আত্মমুকুর । সেখানেই মিলিত হয় অপরিহার্য শব্দের বাণী বিন্যাস ।
কোনো একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে যখন কবির আনন্দ বেদনা প্রকাশের পথ পায় তখনই তা হয়ে ওঠে কবিতা। কবি বেদনাকে আস্বাদ্যমান রসমূর্তি দান করে ব্যক্তিগত বেদনার বিষপুষ্প হতে। কবি যখন কল্পনার সাহায্যে আনন্দমধু আস্বাদন করে তখন বেদনাও রূপান্তরিত ও সুন্দর হয়ে ওঠে। বেদনার যিনি ভোক্তা তিনি তার দ্রষ্টা হতে না পারলে তার দ্বারা কাব্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। আবার অপরিহার্য শব্দের বাণী বিন্যাসে কবি কবিতা সৃষ্টি করেন।
তেমনি আমরা দেখি সংগীত বিশেষজ্ঞদের ভাষায় ‘আনন্দে গান আসে না, দুঃখই সুর জাগায়’। সুরাত্মক ও সহজে উচ্চারণযোগ্য শব্দই যখন কবিতায় ব্যবহৃত হয়ে সুরের প্রাধান্যে বাঙ্ময়তার রূপ পায়, তখনই তা গান হয়ে ওঠে।
আমরা দেখলাম কবিতা ও গানের মধ্যে মূলত কোনো বিরোধ নেই, নেই কোন দ্বন্দ্ব। কারণ একই ভাব ও আবেগ থেকে কবিতা ও গানের জন্ম। কবির অন্তঃস্থল থেকে সৃজনশীল আবেগের বাণীসমূহের বাস্তব রূপ পায় কবিতায় আর সুরের প্রকাশ পায় সংগীতে। আবার কবিতা ও গানের মৌলিক উপাদান একই ধ্বনি বা শব্দ। কবিতা ধ্বনির বর্ণাসৃত আর গান সুরাসৃত। কবিতায় ধ্বনির সৌন্দর্য প্রকাশ পায় শব্দের গাঁথুনির মাধ্যমে, গানে ধ্বনির সৌন্দর্য তরংগায়িত হয় সুরের কারুকাজে। আবার ছন্দের আশ্রয়ে কবিতা, গানের জন্ম, লালন ও বিস্তার। সুতরাং একই ভাব ও আবেগ থেকে কবিতা ও গানের জন্ম, একই ধ্বনিকে আশ্রয় করে উভয়ের বিস্তৃতি এবং একই ছন্দের অবলম্বনে উভয়ের নির্ভরতা। তাই কবিতা ও গানের মধ্যে কোনো বিরোধ বা ব্যবধান নেই, উভয়ের আত্মিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিজ্ঞানসম্মত। সুতরাং কবিতা ও গানের মধ্যে বিরোধের কথা ওঠে না উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক ও মিলনটাই মুখ্য ।
গানের দুটি অঙ্গ, শব্দ এবং সুর, সুরের সমন্বয়ে গান ‘গান‘ হয়ে ওঠে, আবার গান যেহেতু শোনার বিষয় ও গীত হয় সেহেতু সুরের মোহিনী রূপ মানুষকে আকৃষ্ট করে বেশী । গানে তাই বাণী অপেক্ষা সুরের অবদান বেশি। বাংলা সংগীতের দুই দিকপাল হলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁরাই সংগীতাকাশে চন্দ্র সূর্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধিকাংশ গানে সুর অপেক্ষা বাণীর প্রাধান্য বেশি। বাণীর কাব্য সৌন্দর্য অসাধারণ পবিত্রতায় রক্ষা করা হয়েছে। সুরের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ প্রধানত দ্রুপদাশ্রয়ী। দ্রুপদের আঁটসাট বাঁধনে রবীন্দ্র সংগীতের সুর গুলি সুনির্দিষ্ট, সুরের পরিবর্তনএখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আবার রবীন্দ্রনাথের কিছু গানে বিশেষভাবে শেষ পর্যায়ে বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন এবং অন্যান্য সুরের লক্ষ্য করা যায়। তাই রবীন্দ্র সংগীতের গায়ককে কঠোর নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সংগীত জগতে একজন মহান পরিপূর্ণ সংগীতব্যক্তিত্ব। কারণ বাংলা সংগীতের সকল বিভাগ তাঁর দুর্লভ সাংগীতিক –প্রতিভার স্পর্শে পরিপুষ্ট ও পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। নজরুলের সৃজনশীল জীবনের বাইশ বছরের সামান্য অধিক সময় কেটেছে সংগীত জগতে। নজরুল প্রতিভাও স্ফুরণ লাভ করেছে গীতিকবিতায়।
কবি নজরুলের ক্ষেত্রে কবিতা ও গানের যে মহামিলন তা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করার মতো। এ যেন একই চাঁদের এপিঠ ও পিঠ, অথচ দুপিঠেই সমান আলো। উভয়ের মধ্যে কোন ব্যবধান নেই বলে প্রায়শ দেখা যায় একজন বড় কবি একজন স্বনামখ্যাত গীতিকার হয়ে উঠেছেন। আবার তিনি যদি সংগীত বিশারদ হন, শ্রেষ্ঠ সুরকারের খেতাব ও পেতে বিলম্ব হয় না।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উভয়ে বড় কবি সে জন্য বড় গীতিকার হতে পেরেছেন। আবার উভয়েই সুররসিক– সুতরাং শ্রেষ্ঠ সুরকারের মর্যাদায়েও অধিষ্টিত। যা বাংলাসাহিত্যের এক দুর্লভ সৌভাগ্য। তাই তাদের হাত দিয়ে আমরা যেমন উৎকৃষ্ট কবিতা পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি শ্রেষ্ঠ সংগীত। তাঁদের ক্ষেত্রে কবিতা ও সংগীত, সংগীত ও কবিতা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে যে মিলটুকু চোখ পড়ে তাহল উভয়ে ই অসংখ্য গানের গ্রষ্টা,অসংখ্য সুরেরও স্রষ্টা। রবীন্দ্র নজরুল সংগীত বাঙালির হৃদয়ের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে প্রথমেই বলেছি রবীন্দ্র সংগীতের সুর নয় কথাই মুখ্য, নজরুল গীতিতে সুর প্রধান কথা গৌন। রবীন্দ্রনাথের সুরের মূল ভিত্তি হল দ্রুপদ, নজরুলের খেয়াল ঠুংরী। সুর সংযোজনায় একজন দক্ষিণ ভারতীয় সংগীত ধারার মুখাপেক্ষী, অন্যজন উওর ভারতীয় সংগীতসুধায় অবগাহী। সুরের ক্ষেত্রে একজন রক্ষণশীল, পরিবর্তন বিমুখ, অন্যজন উদারপন্থী, পরিবর্তনমুখী। রবীন্দ্র সংগীতে নিয়ম নীতির অনুশাসন বেশী , নজরুল গীতিতে শাস্ত্রীয় বাঁধন কম, সুর বিকাশের অবাধ স্বাধীনতা । বাংলা সংগীতে কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছাড়া আরো যে তিনজন বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন তাঁরা হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত এবং অতুলপ্রসাদ সেন। এঁদের প্রত্যেকের সংগীত ও সুরে কিছু কিছু মৌলিকত্ব ও বৈশিষ্ট্য দৃষ্ট হয়।
সুরের ক্ষেত্রে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মৌলিক বিশেষত্ব হচ্ছে বাংলা গানে তিনি খেয়ালের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন, খেয়াল ভেঙে সুরের সুক্ষ্ম কারুকাজ গুলি নিজের মত করে সুরে আবদ্ধ করেছেন। খেয়াল ও টপ্পা র মিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি আর এক প্রকার সুর সৃষ্টি করেছেন তাঁর সংগীতে যাকে বলা যায় টপ–খেয়াল। কোরাস সংগীত রচনা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আর এক অবদান। তাঁর নাটকের জন্য অনেক ‘থিয়েটারী– গান রচনা করেছেন নানান ধরণের হালকা সুরের খোঁচ মিশিয়ে, যে গানগুলি সৃষ্টি করেছেন তাও তার সাংগীতিক বৈশিষ্টের আর একটি দিক। হাসির গান রচয়িতা হিসেবে ও তার মৌলিকত্ব স্মরণীয়।
রজনীকান্তের সংগীতে ভাষার কোন কারুকাজ নেই, নেই সুরের কোন জটিলতা। ঐশ্বরপ্রেমানুভূতির আবেগে রচিত তার গান সমূহ মৌলিক, সর্বপ্রকার জটিলতামুক্ত। সংগীত ও সুর দুই– নির্মল । প্রাণের আবেগেই তার গান রচনা । গানের বাণী সরল ,সহজ এবং সুন্দর। সুর ও ছন্দে কোথাও কোন বৈদগ্ধ্যের ছাপ নেই। ভক্তি ও ভাবের আকুলতা, ছন্দ ও সুরের এই সারল্যই বাংলা গানে রজনীকান্তের বিশেষ অবদান।
অতুলপ্রসাদ রচিত গানের সংখ্যা খুব বেশী নয়। এ সকল গানেও জটিলতা বা বৈদগ্ধ্যের বেশিমাত্রায় চোখে পড়ে না। ভাবের ক্ষেত্রে অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের অনুগামী। তাই বাণী নয় সুর সৃষ্টির ক্ষেত্রেই অতুলপ্রসাদের মৌলিকত্ব লক্ষণীয়। সুর সৃষ্টিতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করেন নি, খেয়াল এবং বিশেষ করে ঠুংরীর আশ্রয় গ্যহন করেছেন। ঠুংরীর যে কারুকাজে সুরের মাধুর্য বৃদ্ধি পায় বাংলা গানে তিনি কেবল সেটুকু গ্রহণ করেছেন। পঞ্চকবি ছাড়াও বাংলা সংগীতে আরো অনেক কবি আছেন তারা অনেকেই সুরকার নন। কবি হলেই সুরকার হওয়া যায় না– সুরকারকে একাধারে কবি হতে হবে এবং গানের ছন্দে যে সুর সেটি ভালভাবে আয়ত্ত করতে হবে। সুরকার হবেন কবি ও সুররসিক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগীতশিল্পী












