নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ হতে হবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য

ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনকে মেয়র নিজেদের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানাল প্রতিনিধিদল

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

২০০১ সালের পর দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি দাবি করে এজন্য দেশের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরাতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। আর এজন্য উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ মিশনের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিনিধিদলটি আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে করণীয় সম্পর্কে মেয়রের ব্যক্তিগত মতামত জানতে চান। টাইগারপাস নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষক ম্লাদেন কোবাসেভিচের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষক সুজান জিন্ডেল ও দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষক সহকারী মো. মাসুক হায়দার।

শাহাদাত প্রতিনিধিদলকে বলেন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন তথা নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা তথা পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, প্রশাসনসহ সব বাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের ভূমিকা হবে নিরাপত্তা দেওয়া, ভয় সৃষ্টি নয়। মুক্ত গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা তথা সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে নির্বাচন কাভার করতে পারেন। গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

তিনি বলেন, নাগরিক সমাজ এবং দেশিবিদেশি পর্যবেক্ষকদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। নির্বাচনে পোলিং এজেন্টরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইসঙ্গে ভোটকেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি, চাপ বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে।

এ সময় প্রতিনিধিদলটি জানায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন করেছে, যা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি করা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মান দৃঢ় করা।

ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস জ্যাবস, যিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একজন সদস্য। ১১ জনের বিশ্লেষক দল নিয়ে মূল দলটি ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আসে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং মূল দলের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর লক্ষ্যে ১৭ জানুয়ারি সারা দেশে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের কিছুদিন আগে ভোটগ্রহণ, গণনা এবং ফলাফল তালিকাভুক্তকরণ পর্যবেক্ষণের জন্য ৬০ জন স্বল্পমেয়াদী পর্যবেক্ষক মিশনে যোগদান করবেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক সম্প্রদায় এবং অংশীদার দেশগুলো থেকে আরো কয়েকজন স্বল্পমেয়াদী পর্যবেক্ষক এই মিশনে যোগ দেবেন। ইউরোপীয় সংসদের সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদলও এর অংশ হিসেবে থাকবে।

প্রতিনিধিদলটি জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রসহ কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষকের সমন্বয়ে এই মিশনটি তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। এই ব্যাপক অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের অংশীদারিত্বের প্রতিফলন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন এই দেশে অবস্থান করবে। তারা জানান, বাংলাদেশের জাতীয় আইনি কাঠামো এবং দেশটি যেসব আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মানদণ্ড গ্রহণ করেছে, তার ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচন মূল্যায়ন করা হবে।

প্রতিনিধিদলটি জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি মেনে পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন না এবং কোনো ভুলত্রুটি সংশোধন বা পরিবর্তন করার ক্ষমতাও তারা রাখেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সকল পর্যবেক্ষক একটি কঠোর আচরণবিধি ও নৈতিক নির্দেশিকা মেনে চলেন, যা তাদের পুরোপরি নিরপেক্ষতা ও প্রভাবমুক্ত থাকার নিশ্চয়তা দেয়।

তারা জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করে এই মিশনটি সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি তথ্যনির্ভর, সামগ্রিক এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ তুলে ধরবে। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এই মিশনটি তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করবে। এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি মিশনের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর মিশনটি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে একটি বিস্তারিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করবে। এই প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এটি মিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি
পরবর্তী নিবন্ধচকরিয়ায় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের তিন একর ভূমি উদ্ধার