নিজের জীবন দিয়ে মা বাঁচিয়ে গেলেন জমজ সন্তানকে

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ১৯ জুন, ২০২২ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

‘প্রথমে সরানো হয় মাটি। এরপর একটি টিন। টিন সরাতেই চোখে পড়ে শাহীনুর আক্তারের নিথর দেহ। তখনো তার বুকে জড়ানো ছিল ৭ মাস বয়সী দুই যমজ শিশু তাসকিয়া ইসলাম তানহা ও তাকিয়া ইয়াসমিন তিন্নী। তারা ছিল গভীর ঘুমে।’ আকবরশাহ থানার বরিশাল ঘোনা এক নম্বর ঝিলে পাহাড় ধসে প্রাণ হারানো শাহীনুর আক্তারকে উদ্ধার করার সময় এমন দৃশ্য দেখতে পান পাশের ঘরের বাসিন্দা মো. সোহেল। গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের এ বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, শাহীনুরের মৃতদেহ যখন উদ্ধার করি তখন সে ইউ আকৃতির মতো ছিল। এ অবুঝ দুই শিশু হয়ত ঘুমের কারণে বুঝতেই পারেনি পাহাড় ধস হয়েছে।

সোহেলের বোন শাহনাজ জানান, তানহা ও তিন্নীকে কোলে নেয়ার পর ঘুম ভাঙে। এরপর তারা কান্নকাটি করে। এ সময় স্থানীয় লোকজন মন্তব্য করে, হয়তো পাহাড় ধসের বিষয়টি আঁচ করতে পারে শাহীনুর দুই সন্তানকে বুকে আগলে নেন। সন্তানের গায়ে যেন কোনো আঘাত না আসে সেজন্য একদম জড়োসড়ো হয়ে পড়েন। নিজের জীবন দিয়েই বাঁচিয়ে গেলেন দুই সন্তানকে। শাহীনুর ছাড়াও এ ঘটনায় মারা যান তার বোন মাইনুর বেগম। তারা তিন বোন। অপর বোন নার্গিস আকতার। তাদের বাবা ফজলুল হক ও মা মোবাশ্বেরা বেগম আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অর্থাৎ তিন মেয়ের মধ্যে দুজনকেই হারিয়েছেন ফজলুল ও মোবাশ্বেরা দম্পত্তি। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত দুই সন্তানের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি তাদের।

শাহীনুরের শ্বশুরবাড়ি মীরসরাই। যমজ সন্তানকে লালন-পালনের সুবিধার্থে তাদের জন্মের পর থেকে বাবার বাড়ি থাকছেন তিনি। দুই সন্তান আগের চেয়ে একটু বড় হয়েছে। তাই কথা ছিল আগামী বুধবার শ্বশুরবাড়ি চলে যাবেন। কিন্তু মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শ্বশুরবাড়ির বদলে স্থায়ী জায়গা করে দিল কবরে। এ তথ্য আজাদীকে নিশ্চিত করেছেন উদ্ধারের পর শাহীনুরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা তাদের কাজিন রেশমা।

জানা গেছে, দুর্ঘটনায় নিহত মাইনুর গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তার বিয়ে হয়েছিল। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্বশুরবাড়ি তুলে নেয়ার আগেই ডিভোর্স হয়ে যায়।
দুর্ঘটনাস্থলের কাছে শাহীনুরের বোন নার্গিসের বাসা। তানহা ও তিন্নীকে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। গতকাল দুুপুরে ওই বাসায় দেখা গেছে, একজন তাদের খালাতো বোন ইয়াসমিনের (নার্গিসের মেয়ে) কোলে চুপচাপ শুয়ে আছে। আরেকজন বিছানায় খেলছে আপন মনে। তাদের পাশে ছিল শাহীনুরের চার বছর বয়সী ছেলে তরিকুল ইসলাম তানিম। তারও বোঝার ক্ষমতা বেশি হয়নি। সেও জানে না মা তাদের তিন ভাই-বোনকে ফেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে।

ইয়াসমিন বলেন, কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হলেই নানা এবং খালামনিরা ওই বাসায় থাকত না। আমাদের বাসায় এসে রাতে থাকত। কাল কেন ছিল জানি না। তবে রাতে তানিমকে নিয়ে খালু জয়নাল আবেদীন আমাদের বাসায় ছিল। এ কারণেই তারা রক্ষা পেয়েছে।

শাহীনুরের স্বামী জয়নাল আবেদীন উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, বৃষ্টি হলে আমরা ওই বাসায় থাকতাম না। এবার যখন বৃষ্টি শুরু হলো, তখন তাদের বলেছিলাম নার্গিসের বাসায় চলে আসতে। তারা আসেনি। আমার মেয়ে দুটিকে আল্লাহ রক্ষা করেছে। ছেলেটি আমার সঙ্গে ছিল বলে বেঁচে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রাণহানির পর পাহাড়ে আজ বড় অভিযান
পরবর্তী নিবন্ধঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরানো যায়নি ১৫ বছরেও