নিউইয়র্কের উপশহরের এক শীতল সকালে জানালার কাঁচে সূর্যের আলো এসে পড়ে এমনভাবে, যেন কেউ বাইরে থেকে ভেতরের জীবনটাকে ছুঁয়ে দিতে চায়। রুবিনা সেই আলোয় চোখ রাখে, কিন্তু তার চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যেন আলোটা তার কাছে এখন কেবল এক মৃত স্মৃতি–একসময় যেটা হাসতো, উষ্ণতা দিত, এখন শুধু ছায়া ফেলে।
চুলায় পানি ফুটছে, কেটলির সিটি বাজে। কিন্তু রুবিনা শুনতে পায় না। তার শ্রবণ এখন বেছে নেয় কোন শব্দকে গ্রহণ করবে–যে শব্দে নাওরিন ছিলো, সেগুলোই কেবল তার কাছে জীবন্ত। বাকিগুলো প্রতিধ্বনি, যেন দূর থেকে কেউ ডাকছে, কিন্তু সে সাড়া দিতে ভুলে গেছে।
এই শহরে তারা দুজন রুবিনা আর হাসান দুই প্রবাসী আত্মা, যারা একদিন ঢাকার গলির ধুলোমাখা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলো আমেরিকায়। হাসান তখন ছিলেন এক প্রাণবন্ত মানুষ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে সন্ধ্যা, আর উইকএন্ডে মেয়েকে নিয়ে পার্কে ঘুরে বেড়ানো ছিলো তার জীবনের রুটিন। রুবিনা ছিলেন রুচিশীল, সাজগোছ ভালোবাসতেন। সূতি শাড়ি, হালকা সূচিকাজের ব্লাউজ, আর চোখে কাজল যেন রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতার চরিত্র।
তাদের জীবনে স্থিরতা এসেছিলো, সত্যি, কিন্তু সেই স্থিরতা একদিন স্থবিরতায় পরিণত হয়। সেইদিন, যেদিন নাওরিন হারিয়ে গেলো।
নাওরিন ছিলো এক আলো, যা কাচের ভেতর থেকেও ঝলকায়। তার হাসিতে বাড়ি ভরে থাকত।
“বাবা, তুমি এত সিরিয়াস কেন?”
“মা, তোমার রান্নার গন্ধে তো পুরো বিল্ডিং খালি হয়ে যাবে।” এইসব কথাগুলো এখন ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
ছোটবেলা থেকেই নাওরিন খাওয়ার সময় একটু কষ্ট পেত। ডাক্তার বলেছিলো, “এটা একধরনের esophageal spasm ।” খুব ছোট্ট একটা সার্জারি করলেই নাওরিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। রুবিনা ভেবেছিলো, মেয়েটা এবার তার স্বপ্নের আইভিলীগ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা শুরু করতে যাচ্ছে, ওখানে যাওয়ার আগে এটা সারিয়ে নেওয়াই ভালো তাতে মেয়েটার জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসবে।
সার্জারির দিন সকালে, হাসান মেয়ের জন্য প্রিয় গানটা গেয়ে উঠেছিলো-“আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে” নাওরিন বলেছিলো, “বাবা, তুমি গাইলে তো বৃষ্টি থেমে যাবে।”
রুবিনা তখন মেয়ের চুলে বেণি বাঁধছিলো, বলেছিলো, “আজকে তুমি আমার ছোট্ট রাজকন্যা।”
তারপর সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো।
একজন নার্স ছুটে এসে বলেছিলো, “ We are so sorry ” বাকিটা তারা শোনেনি। হাসানের বুকের ভেতর তখন কোনো হৃদস্পন্দন ছিলো না, শুধু শুনছিলো যেন কেউ নিঃশব্দে একটি জানালা বন্ধ করে দিলো, আর সমস্ত পৃথিবীর আলো নিভে গেলো একসাথে।
তারপর থেকে দিন–রাত মিশে গেছে এক অনন্ত সময়ের কুয়াশায়। বাইরের পৃথিবী বদলায়, কিন্তু ওদের ঘরের ভেতর সময় থেমে আছে।
হাসান এখন আর আড্ডা দেয় না, গান শোনে না, এমনকি রেডিও চালু করলেও চুপচাপ বসে থাকে। তার চোখে একধরনের স্থায়ী ক্লান্তি, যেন প্রতিটি পলকেই সে মেয়ের মুখ খোঁজে। রুবিনা তিন বছর ধরে কোথাও যায়নি। একসময় যে নারী সাজগোজ করে পার্টিতে যেতেন, এখন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ান না। শাশুড়ি একদিন একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন রুবিনার প্রিয় রঙে, প্রিয় কাজের। কিন্তু সে সেটা খুলেও দেখেনি।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় রুবিনা টেবিল সাজায় তিনটি প্লেট, তিনটি গ্লাস, তিনটি চামচ। তৃতীয় প্লেটে রাখে নাওরিনের প্রিয় খাবার পোলাও, আলুভাজা, আর ছোট্ট এক টুকরো লেবু। পাশে এক গ্লাস পানি, ঠিক যেভাবে মেয়েটা চাইত। হাসান প্রতিবার টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলে, “ও না এলে খাওয়া ঠিক লাগে না।” রুবিনা জবাব দেয় না, শুধু হাসে–যে হাসিতে থাকে প্রতিদিনের মৃত্যু, তবুও বেঁচে থাকার অভ্যাস।
একদিন তারা পুরনো ফটো অ্যালবাম খুললো। ছবিতে নাওরিন দাঁড়িয়ে আছে লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে, পাশে হাসান, রুবিনা। তিনজনের মুখেই একরকম আলো। রুবিনা আঙুল ছুঁয়ে বলল, “দেখো, ওর চোখে কত আকাশ জমে আছে।” হাসান কিছু বলল না। কেবল ধীরে ছবিটা বন্ধ করল, কারণ কিছু স্মৃতি শুধু দেখা যায়, বলা যায় না।
রাতে তারা টিভি চালায়, নাওরিনের প্রিয় মুভিটা দেখে। একসময় হাসান চুপচাপ রিমোট নামিয়ে রাখে। “এই সিনেমাটা শেষ হয়, কিন্তু আমাদের গল্পটা তো থামে না,” সে বলে মৃদুস্বরে। রুবিনা মাথা তুলে তাকায় তার চোখে তখন শান্ত এক সমুদ্র, যেখানে ঢেউ নেই, শুধু গভীরতা।
এক রাতে, জানালার বাইরে জোছনা ঝুলে থাকে মেয়েটির নামের মতো সাদা, শান্ত, অথচ স্পর্শহীন।
রুবিনা চোখ বন্ধ করে বলে, “শুভরাত্রি মা”
আর বাতাসে মৃদু একটা কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়-“শুভরাত্রি মা”
সেই রাতে, হাসান ঘুমের মধ্যে হঠাৎ উঠে বসে। তার চোখে জল, ঠোঁটে একটুকরো হাসি। “ওর গলায় আজ আর কষ্ট হচ্ছিল না,” সে বলে। রুবিনা কিছু বলে না, শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সেখানে জোছনার ভেতর একটুকরো আলো, যেন কেউ হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, দূরে, আরও দূরে
সকালে টেবিলে তিনটি কাপ রাখা থাকে। দুটি খালি, একটিতে ধোঁয়া ওঠে, ওটা নাওরিনের।
কিন্তু সেই দিন, কাপটা খালি ছিল। রুবিনা বুঝে যায়, আজ মেয়েটি আসেনি। হয়তো সে চলে গেছে আরও দূরে, যেখানে প্রার্থনারও সীমা থাকে।












