তবুও ঝুঁকি নিয়ে বসবাস

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধস রোধে নেই টেকসই ব্যবস্থাপনা

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি | বুধবার , ৯ জুন, ২০২১ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ

তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। টানা বৃষ্টিতে সবুজবাগ, শালবাগান, কুমিল্লাটিলা, কলাবাগান, কদমতলীসহ শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এসব জায়গায় আরো ধসের আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
এদিকে, পাহাড় ধসের আতংক নিয়ে বসবাস করছে স্থানীয়রা। তারা বলছে, বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হচ্ছে। ঝুঁকি জেনেও কেবল পৌর শহরে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি পরিবার।
সরেজমিনে পৌর এলাকার সবুজবাগে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত পাঁচটি পাহাড়ের আংশিক ধস হয়েছে। এর মধ্যে একটি বসতঘর ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। কয়েকদিন বৃষ্টি পড়লে ঘরটি ধসে পড়বে।
সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মোতালেব, রহুল আমিন ও সানজিদা খাতুন জানান, বৃষ্টি মাত্র শুরু হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ের মাটি ধসে গেছে। আতংক নিয়ে বসবাস করছি। বৃষ্টি হলে রাতের বেলায় ভয়ে ঘুম আসে না। গত বছর এখানে ধস হয়েছে। ঝুঁকিপুর্ণ এলাকা রিটেইনিং ওয়াল দেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
টেকসই ব্যবস্থাপনা নেই : প্রতি বছর বর্ষা এলে পাহাড়ে বসবাসরতদের মাঝে আতংক বাড়ে। এ সময় পাহাড় ধস রোধে প্রশাসনও তৎপর হয়। প্রতি বছর বর্ষায় পাহাড় ধস মোকাবেলায় প্রশাসন প্রস্তুতি নিলেও তা সাময়িক। মূলত পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কাজ করে প্রশাসন। ধস রোধে স্থায়ী, ঠেকসই ব্যবস্থাপনা বা পরিকল্পনা নেই। ফলে প্রতি বছর পাহাড় ধস বা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। পাহাড় কেটে পাদদেশে কিংবা পাহাড়ের উপর বসবাসরতদের বেশিরভাগই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। বিকল্প উপায় না পেয়ে বছরের পর বছর তারা এখানে বসবাস করছে। মৃত্যুঝুঁকি জেনেও বাধ্য হয়ে তারা থাকছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপন ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে পাহাড় কাটা হলেও মানা হচ্ছে না উন্নত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল। অভিযোগ আছে, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা রোধে প্রশাসনের ভূমিকা কম। এর ফলে ভূমিদুস্যরা পাহাড় শেষ করে দিচ্ছে। বাণিজ্যিক কারণে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলেও পাহাড় প্রাকৃতিকভাবে ধস প্রতিরোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া অতি বৃষ্টিপাতের কারণে ধসের ঘটনা ঘটছে। ২০১৭ সালে পার্বত্য তিন জেলায় প্রায় ৯০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা সারা দেশের দুই মাসের বৃষ্টিপাতের সমান। এছাড়া প্রতি বছর মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে পাহাড়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়।
খাগড়াছড়ির পৌর এলাকা ছাড়াও জেলার মাটিরাঙা, দীঘিনালা, রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি ও মহালছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে স্থানীয়রা। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাসরত কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এখানে আমরা বছরের পর বছর বসবাস করছি। অন্য কোথাও থাকার জায়গা নেই। এসব জায়গায় বসবাসরতরা ভূসম্পত্তি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। এমনকি ভারী বর্ষণে প্রশাসনের সতর্কতার পরও তারা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করে।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, খাগড়াছড়িতে সরকারিভাবে পাহাড় কেটে উন্নয়নের প্রবণতা বেশি। পাহাড় কাটা আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ না থাকায় এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা আইনে প্রয়োগ করবে তারাই পাহাড় কাটছে। পাহাড় কাটার ফলে ধস বাড়ছে। প্রতি বছর পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটলেও ধস রোধে টেকসই কোনো ব্যবস্থাপনা নেই।
খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, পৌর এলাকায় চারটি স্থানে পাহাড় ধসের ঝুঁকি রয়েছে। প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বসবাসকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। যারা ঝুঁকিতে রয়েছে তাদেরকে পৌরসভা সার্বিক সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে পৌর আবাসন এলাকায় পুনর্বাসন করা হবে।
এদিকে পাহাড় ধসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং দুর্যোগ কবলিতদের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা মতিন বলেন, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের শঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। পাহাড় ধসে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিশ্বজুড়ে সংঘবদ্ধ চক্রের ৮ শতাধিক সদস্য গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধহতাশায় আত্মঘাতী কলেজছাত্র