জ্বালানি তেলের সংকটের যৌক্তিক কারণ নেই

রেশনিং নয়, মনিটরিং জোরদার হোক পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরামর্শক কমিটি গঠনের তাগিদ

হাসান আকবর | রবিবার , ২৯ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রভাব বাংলাদেশে যতটুকু পড়ার কথা তার চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টিকে ‘ব্যবস্থাপনার অনভিজ্ঞতা’ বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গালফ ওয়ারসহ বিভিন্ন ক্রাইসিস মোকাবেলায় বিপিসি বা তেল কোম্পানিগুলোর অবসরে যাওয়া অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অন্তত ৫ জনকে নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবেলার উদ্যোগ নিলে সুফল মিলবে। দেশে প্রচুর জ্বালানি তেল আমদানি এবং দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ দেওয়া হলেও শুধুমাত্র ‘পেনিক বায়িং’ এর কারণে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের হাহাকার শুরু হয়েছে। মানুষকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আশ্বস্ত করার মাধ্যমে জ্বালানি তেল নিয়ে যে সংকট দেখা যাচ্ছে তা রোধ করা সম্ভব বলে তারা মন্তব্য করেছেন। রেশনিং বন্ধ করে মনিটরিং জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছেন, পেনিক না থাকলে বাড়তি তেল কেনার প্রবণতা দ্রুত কমে যাবে।

দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ টনের কাছাকাছি। এর ৭৫ শতাংশ ডিজেল। মোট চাহিদার ৬৭ শতাংশ পেট্রোল ও অকটেন। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২১শ টন পেট্রোল এবং ১৯৫০ টন অকটেনের চাহিদা রয়েছে। ব্যবহৃত পেট্রোলঅকটেনের প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদিত হয় দেশে। গ্যাসক্ষেত্রের তলানি কনডেনসেট ও ন্যাফথা থেকে সরকারিবেসরকারি রিফাইনারিগুলো এই পেট্রোল এবং অকটেন উৎপাদন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে বাজারজাত করে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সাথে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর উৎপাদনের কোনো সম্পর্ক নেই। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কনডেনসেট দিয়ে তারা পেট্রোল এবং অকটেনসহ পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট উৎপাদন করে বাজারে সরবরাহ করে। অথচ দেশে বর্তমানে পেট্রোলঅকটেন নিয়ে সবচেয়ে বেশি হাহাকার বিরাজ করছে। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে বাঁশ ও দড়ি ঝুলছে, ঝুলছে ‘পেট্রোল ও অকটেন নেই’ নোটিশ। আবার প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের যে দীর্ঘ লাইন তাও পেট্রোল ও অকটেনকেন্দ্রিক।

পেট্রোলঅকটেনের সংকটের কোনো কারণ নেই মন্তব্য করে বিপিসির কর্মকর্তারা বলেছেন, পেট্রোল ও অকটেনের মজুদ এবং সরবরাহ চেইন ঠিকভাবে কাজ করছে। অনাহূত কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে ভোগান্তি চলছে। আতংকগ্রস্ত মানুষ চাহিদার তুলনায় বেশি পেট্রোল এবং অকটেন কিনছে, তাই বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সিএনজি বা এলপিজি দিয়ে চলে এমন গাড়িতে আগে যারা এক হাজার টাকার পেট্রোল কিংবা অকটেন নিতেন, তেল পাওয়া যাবে না এমন আতংকে তারাও ফুল ট্যাংক তেল নিচ্ছেন। অনেকে ফুল ট্যাংক নেওয়ার পর কয়েক লিটার কমার পর আবার গিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। তাদের ধারণা, তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব ট্যাংকে ভরে রাখি। অনেকে ড্রামে ভরে দুইচারশ লিটার তেল মজুদ করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাসায় নিয়ে রাখছেন।

রেশনিং থেকে এই পেনিক বায়িং সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রেশনিং তুলে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারলে সংকট কেটে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সাথে পেট্রোলঅকটেনের সম্পর্ক না থাকার বিষয়টি মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে।

বিপিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী মাসের শুরুতে ৫০ হাজার টন অকটেন নিয়ে দুটি ট্যাংকার চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। সিঙ্গাপুর থেকে অকটেনের এই চালানটি দেশে আসছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, পেট্রোল বা অকটেন সামান্য পরিমাণে আমদানি করা হয়। এখন ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কিছুটা ঝুঁকিতে পড়ায় বাড়তি ৫০ হাজার টন অকটেন আমদানি করে মজুদ ঠিক রাখা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। পেট্রোল বা অকটেনের তো নয়ই। শুধুমাত্র হুড়োহুড়ি করে বিরাজমান পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এবং সামনে বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবেএমন আশায় অনেক পেট্রোল পাম্প মালিক অবৈধভাবে মজুদ করার চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের কড়াকড়ি এবং নজরদারি জোরদার হলে এই অপতৎপরতা বন্ধ হবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, দেশের জ্বালানি তেলের মাত্র ২০ শতাংশ আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে। ক্রুড অয়েল আমদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে এই তেলের যোগান দেওয়া হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে ১৪ ধরনের পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট উৎপাদন করা হয়। এখান থেকে সামান্য পরিমাণে অকটেন উৎপাদিত হয়। দৈনিক ৪ হাজার টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করলে অন্যান্য প্রোডাক্টের সাথে ৩শ৪শ টন অকটেন পাওয়া যায়। ইস্টার্ন রিফাইনারির এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে হরমুজ বা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি জড়িত। কারণ ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ব্যবহৃত ক্রুড অয়েল আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রায় দুই লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে দুটি জাহাজ হরমুজের কারণে আটকা পড়ায় ইস্টার্নের উৎপাদন কিছুটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই ঝুঁকি সামাল দিতেই মূলত ৫০ হাজার টন অকটেনসহ অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়িয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, যুদ্ধে আটকে যাওয়া ক্রুড অয়েলের কারণে দেশের জ্বালানি তেলের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জড়িত। বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়ে তা মোকাবেলা সম্ভব। বাংলাদেশে পরিশোধিত প্রায় ৫০ লাখ টন জ্বালানি তেলের বেশির ভাগ আমদানি করা হয় সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ও ভারত থেকে। এর সাথে হরমুজের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। কয়েকটি জাহাজের সিডিউল কিছুটা এদিকওদিক হলেও গত এক মাসে অন্তত ২৫টি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। এসব জাহাজে পর্যাপ্ত ডিজেল আমদানি করা হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আগে আমদানি করা ক্রুড অয়েল দিয়ে উৎপাদন চলছে।

ক্রুডের অভাবে রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ হলেও পূর্ব দিকের দেশগুলো থেকে ডিজেল আমদানি বাড়িয়ে তা মোকাবেলার সুযোগ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, এখন পরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়ে চাহিদা মেটানো জরুরি, পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইস্টার্নকে পুরো উৎপাদনে নিয়ে পরবর্তী সময়কার চাহিদা মোকাবেলা সম্ভব হবে।

তবে বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি, আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য বড় পরিসরে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাসেই প্রায় ৩ লাখ টন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি আমদানি করা হবে এবং মে মাসেও একাধিক জাহাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দেশে আনার সিডিউল তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হলেও বিকল্প উৎস থেকে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ‘অনভিজ্ঞতার’ একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় ক্রাইসিস মোকাবেলা করা জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিপিসি এবং তেল বিপণন কোম্পানিগুলো থেকে অবসরে যাওয়া অভিজ্ঞ অন্তত ৫ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি পরামর্শক টিম গঠন করে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধট্রাম্পের সামনে এখন কেবল কঠিন বিকল্প
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের তথ্য পাঠানো হলো ইসিতে