ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। দুদকের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসা এ ঘটনায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রুবেল হোসেন বাদী হয়ে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম–১ এ মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭–এর ৫(২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২–এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আরামিট গ্রুপের শীর্ষ কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাও এতে আসামি হয়েছেন। আসামির তালিকায় রয়েছের জাবেদের স্ত্রী রুকমীলা জামানও।
মামলার আসামিরা হলেন, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, আরামিট সিমেন্টের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও ইউসিবির সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ শাহ আলম, আরামিট সিমেন্টের এজিএম একেএম মারুফ, ক্লাসিক ট্রেডিং এর মালিক ও আরামিট পিএলসির এজিএম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ইসলামী ব্যাংক জুবিলী রোড শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মহিউদ্দিন, প্রিন্সিপাল অফিসার (বিনিয়োগ) মোহাম্মদ আখতার হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার ও জেনারেল ব্যাংকিং ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুল হক, ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জ মো. আবদুল কাদের, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জুবিলী রোড শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবদুল করিম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. শহিদুল্লাহ, এফএভিপি মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, এসভিপি আবুল কালাম আজাদ, এসভিপি মোহাম্মদ মহসীন আলী এবং এসপিও রিদওয়ানুল হক।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের বহদ্দারহাট শাখায় আরামিট সিমেন্ট লি.-এর নামে চলতি হিসাব খোলা হয়, যা পরে ২০১৭ সালের ১৫ মে জুবিলী রোড শাখায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর ২০১৭ সালের অক্টোবরে ৫০০ কোটি টাকা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণের আবেদন করে আরামিট সিমেন্ট। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকের নির্বাহী কমিটি ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে। পরবর্তীতে গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ভুয়া ৫৪ টি বাই–মুরাবাহা ডিলের মাধ্যমে ২০৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের অর্থ বিতরণ করা হয়। বলা হয়, সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের কর্মচারী তথা এজিএম (হিসাব) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী হিসেবে সাজানো হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ‘ক্লাসিক ট্রেডিং’ নামের একটি অস্তিত্ববিহীন কাগুজে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো হয়। ইউসিবি পিএলসির স্টেশন রোড শাখায় খোলা এই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ড্রামপট্টি, নতুন চাক্তাই, চট্টগ্রাম উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো অফিস, ওয়্যারহাউজ বা গুদাম বা আমদানির কোনো প্রমাণ পায়নি দুদক।
এজাহারে আরো বলা হয়, আরামিট সিমেন্টের সিএফও মোহাম্মদ শাহ্ আলমের নেতৃত্বে ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৭টি ভুয়া ‘বাই মুরাবাহা ডিল’ তৈরি করা হয়। স্থানীয় বাজার থেকে ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন, স্ল্যাগ ইত্যাদি কাঁচামাল কেনার মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংক, জুবিলী রোড শাখায় বিল দাখিল করা হয়। ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখার বিনিয়োগ কমিটির সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (আসামি ৬ থেকে ১৫ নম্বর পর্যন্ত) কোনো ধরনের যাচাই–বাছাই না করে, ভুয়া ইনভয়েসের বিপরীতে এবং প্রয়োজনীয় ক্যাশ সিকিউরিটি ছাড়াই অফিস নোট প্রস্তুত ও স্বাক্ষর করে পে–অর্ডার ইস্যু করেন। এভাবে মোট ২৭টি ভুয়া ডিলের মাধ্যমে মোট ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। পরবর্তীতে উত্তোলিত এই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে (যেমন–ইউসিবি এনায়েত বাজার ও স্টেশন রোড শাখা, আইএফআইসি ব্যাংক শাহ আমানত মার্কেট শাখা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক জুবলী রোড শাখা) স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের হিসাবে এবং আরামিট গ্রুপের কর্মচারীদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে জমা করা হয়। এর মাধ্যমে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম–১ এর উপ–পরিচালক আল আমিন দৈনিক আজাদীকে মামলা দায়েরের তথ্যটি নিশ্চিত করে বলেন, তদন্তে অন্য কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে আমলে নেওয়া হবে।












