রাঙামাটি পৌরসভায় ভূ–গর্ভস্থ পাইপ লাইন বসানোর কাজ করছে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। পাইপ লাইন বসানোর জন্য সড়কের পাশের মাটি খুঁড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু মাটি খোঁড়ার কারণে এ পর্যন্ত ১৩ দফায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ কর্তন করা হয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্ট থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর চারবার চিঠি দিয়েছে বিটিসিএলের রাঙামাটির ডিজিএম। চারবার চিঠি দিয়েও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের কাছে থেকে কোনো প্রতিকার পায়নি বলে অভিযোগ করছে বিটিসিএল। উদ্ভূত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠেছে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকেও, তবুও হয়নি কোনো সমাধান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চলমান ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’ কাজের খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১২ মার্চ (গতকাল) পর্যন্ত ১৩ দফায় বিটিসিএলের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরমধ্যে হাসপাতাল রোড, রাজবাড়ী রোড, রাঙাপানি বাজার, পর্যটন করপোরেশন, ডিসি বাংলো, যুব উন্নয়ন এলাকা, বনরূপা কাঁচা বাজার, মোনঘর এলাকা, মন্ত্রীপাড়া পূর্ব ট্রাইব্যাল আদাম, সেনানিবাস এলাকার সামনে, পুনম হার্ডওয়্যার পার্শ্ববর্তী এবং সবশেষ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পাবলিক হেলথের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মনির ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন। এরমধ্যে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট ও ১৯ নভেম্বর দুই দফায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে পানি সরবরাহ পাইপ লাইন স্থাপন কাজে ক্ষতিগ্রস্ত ভূ–গর্ভস্থ টেলিফোন ও ইন্টারনেট লাইন মেরামতের জন্য অনুরোধ জানায় বিটিসিএল। এরপর চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারির পর ১২ মার্চ চতুর্থ দফায় চিঠি দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
রাঙামাটি ডিপিএইচইর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর চতুর্থ দফায় লেখা চিঠিতে রাঙামাটি বিটিসিএল জানিয়েছে, আপনার দপ্তরের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটিতে ভূ–গর্ভস্থ পাইপ বসানোর কাজ চলমান রয়েছে। কাজ চলাকালীন আপনার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়োগকৃত ঠিকাদার মেসার্স মনির ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন দ্বারা মাটি কাটার সময় বিভিন্ন স্থানে বিটিসিএলের ১২ মার্চ পর্যন্ত ১৩টি স্থানে ভূ–গর্ভস্থ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত দুঃখজনক। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) উপস্থিতিতে উক্ত বিষয়ে আলোচনাকালীন সময়ে আপনার দপ্তর কর্তৃক দ্রুত নিরসনের নিশ্চয়তা প্রদান করা হলেও অদ্যবধি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে একাধিকবার মিটিং করে তাদেরকে বিটিসিএলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার অনুরোধ জানানো হলেও তারা মৌখিক আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও কোনো যোগাযোগ রক্ষা করার প্রয়োজন মনে করে না। ১৩টি স্থানে ভূ–গর্ভস্থ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় বিটিসিএলের গ্রাহকসেবার মান নিম্ন হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে এবং সরকারি অর্থের ব্যাপক অপচয় হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো বিটিসিএল নেটওয়ার্কের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় বিটিসিএলের ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবলসমূহ মেরামত করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ প্রদানের অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। এছাড়া বিটিসিএলের সঙ্গে সমন্বয় ব্যতিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেন নতুন করে কোন কাজ না করে সেজন্য বিষয়েও আহবান জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানকারী সংস্থাটি।
বিটিসিএল জানিয়েছে, ১৩ দফায় টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক মজুরি ব্যতিত ১০–১২ লাখ টাকা মেরামতবাবদ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। রাঙামাটি শহরজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০ টেলিফোন সংযোগসহ দেড় হাজারের মতো ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। এদিকে সাধারণ গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিসিলের সেবার মান তেমন ভালো নয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে হঠাৎ করে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, এরপর পুরো এক–দুইদিনও সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকছে। জরুরি সেবা হলেও সময় মতো প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এতে করে বেসরকারি (প্রাইভেট) ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে সাধারণ গ্রাহকরা।
বিটিসিএল রাঙামাটি কার্যালয়ের (পার্বত্য অঞ্চল) উপ–মহাব্যবস্থাপক শিশির কুমার চক্রবর্তী বলেন, গত বুধবার দুইটি সংযোগ কাটা গেছে। এরমধ্যে একটি আমরা সচল করতে পেরেছি। আরেকটি সচলের জন্য কাজ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মনির ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশনের স্টাফ ইঞ্জিনিয়ার শামীম রায়হানের মুঠোফোন একাধিকবার কল দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বক্তব্য আহ্বান করে ক্ষুদে বার্তা দেয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, সমন্বয়হীনতা না, এখানে তাদের সংযোগ লাইনের ড্রয়িং ম্যাপটা আপডেটেড না। সংযোগ কাটা গেলেও আমরা সায়মিক সচল করে দিই। আমরা বারংবার তাদের প্রতিনিধির সঙ্গে আমাদের লোকদের বসিয়েছি, আমাদের সহকারী প্রকৌশলীকে ট্যাগ করে দিয়েছি সমন্বয় করে নেয়ার জন্য। তারপরও কাজ করতে গেলে লাইন কাটা গেলে আমরা টিক করে দেব।
এ ঘটনা নিয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক আগে আগের ডিসি থাকাকালীন এটা নিয়ে একটা আলোচনা হয়েছিল, তখন প্রায় প্রাথমিক পর্যায় ছিল। এখন তো আমাদের পাইপ লাইনের কাজও অনেক দূর হয়ে গেছে, প্রায় শেষের দিকে। সামনে আশাকরি এমন পরিস্থিতি হবে না, যেগুলা হয়েছে সেগুলো আমরা একটি–একটি সমাধান করে দেব। তাদের ম্যাটেরিয়ালগুলা সহজলভ্য না। দেখা গেছে তাদের টাকা দিলেও তারা কিনে এনে লাগাতে পারছেন না। আবার দেখা গেছে ডিসি অফিসের সামনে সংযোগ কাটা গেছে, তারা বলছেন বনরূপা থেকে জেলা পরিষদ পর্যন্ত সংযোগ লাইন মেরামত করে দিতে, এগুলো নিয়ে মাঝেমধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হয়। যে কারণে আমাদের যারা কাজ করে তাদের মধ্যেও অনীহা সৃষ্টি হয়।











