চট্টগ্রামের রাউজানে এক পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় ৭ মাস বয়সী শিশু মিরাজের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। সন্তান হারানোর তিন দিন পার হয়ে গেলেও শোক সামলাতে পারছেন না দিনমজুর বাবা মুহাম্মদ মানিক। ছেলের জন্য কেনা নতুন জামা হাতে নিয়ে কবরের পাশেই বসে অঝোর ধারায় কাঁদছেন তিনি।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ১ নম্বর হলদিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, দিনমজুরি করে অর্জিত সামান্য আয় দিয়ে মানিক-ইয়াছমিন দম্পতির সংসার চলছিল। প্রায় ৭ মাস আগে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে মিরাজের জন্ম হয়। হাসপাতাল খরচ জোগাতে স্ত্রীর একজোড়া স্বর্ণের কানের দুল বিক্রি করতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে নিজের কষ্টার্জিত টাকা জমিয়ে ছেলের জন্য একটি নতুন জামা কিনেছিলেন মানিক।
গত ২১ সেপ্টেম্বর (সোমবার) শিশু মিরাজের শরীরে জ্বর ও ঠান্ডা দেখা দেয় এবং সে বুকের দুধ পান করা বন্ধ করে দেয়। গত বৃহস্পতিবার শিশুটিকে আমিরহাট বাজারে অবস্থিত ‘মেসার্স এয়াছিন শাহ্ ড্রাগ হাউস’-এ নিয়োজিত স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক দোলন রায়ের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই চিকিৎসকের ওষুধ সেবনের পর শিশুটির মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ শিশুটির বাবা মানিকের।
শিশুটির চাচা মোরশেদ অভিযোগ করে জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করানোর পরপরই শিশু মিরাজ তীব্র কান্না শুরু করে এবং খিঁচুনি উঠে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত পুনরায় দোলন রায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি শিশুটিকে না দেখেই এড়িয়ে যান এবং অন্য বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে শিশুটিকে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের বরাত দিয়ে মোরশেদ আরও বলেন, “হাসপাতালের চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেখে আমাদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, ৭ মাসের একটি শিশুকে ৭ বছর বয়সী শিশুর জন্য প্রযোজ্য ওষুধ প্রদান করা হয়েছিল। এই অতিরিক্ত মাত্রার (ওভারডোজ) ভুল ওষুধ সেবনের কারণেই বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে।”
অভিযুক্ত চিকিৎসক দোলন রায় ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং বর্তমানে রাউজান পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাসবিহারী ধাম এলাকায় বসবাস করছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দোলন রায় বলেন, “শিশুটিকে আমার কাছে আনার পর আমি শুরুতেই হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারটি দরিদ্র হওয়ায় তারা হাসপাতালে না নেওয়ার কথা জানালে আমি চিকিৎসা সেবা দিই। তবে আমার দেওয়া ওষুধ সেবন করার আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।”
শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. টিবলু কান্তি দে বলেন, “শিশুরা বুকের দুধ পান বন্ধ করে দিলে বা না খেলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা অত্যন্ত জরুরি। এর ব্যত্যয় ঘটলে শিশুর প্রাণহানির চরম ঝুঁকি থাকে।”
রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও শিশু-কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফরিদ আহাম্মদ বলেন, “বর্তমানে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ বেশি। শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করা ঠিক নয়। দুধ পান না করা বা অন্যান্য জটিল শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে অতি দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করালে মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে যায়।”
এ বিষয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, “এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এদিকে একমাত্র শিশু ছেলেকে হারিয়ে মা ইয়াছমিন আকতার মানসিক দিশেহারা হয়ে পড়ায় তাকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কবরের পাশে অবুঝ ছেলের নতুন জামা ধরে বাবার বুকফাটা কান্না দেখে অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।











