চার ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ কার্বন মনোক্সাইড

মা এখনো জানেন না সন্তানদের মৃত্যুর কথা

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি | শনিবার , ১৬ মে, ২০২৬ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

ওমানে একটি গাড়ির ভেতর থেকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চার প্রবাসী ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে দেশটির পুলিশ। রয়্যাল ওমান পুলিশের বরাত দিয়ে টাইমস অব ওমানে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আল বাতিনা গভর্নরেট পুলিশের নেতৃত্ব আলমাসনা গভর্নরেট এলাকায় বুধবার রাতে একটি গাড়ির ভেতর থেকে ওই চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এটির এক্সজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসগ্রহণের ফলে ওই চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় প্রবাসীরা জানান, বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাত ৮টার পর তাদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে অসুস্থতার কথা বলেন। নিজেদের লোকেশন পাঠিয়ে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মত অবস্থাও তাদের নেই। পরে একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

বিডিনিউজ জানায়, চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ইন ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরীর বরাত দিয়ে টাইমস অব ওমান বলছে, মৃত চারজনেরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে একজন নিজওয়ায়, আরেকজন সুওয়াইকে এবং বাকি দুজন মুলাদাহে বসবাস থাকতেন। এ ঘটনার পর বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্বাসরোধের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রয়্যাল ওমান পুলিশ আবদ্ধ অবস্থায় যানবাহনের ভেতরে না ঘুমাতে এবং ঘুম চোখে যানবাহন চালানো থেকে বিরত থাকতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে ওমানে গাড়ির এসি থেকে বিষাক্ত গ্যাসের কারণে মর্মান্তিকভাবে নিহত চার প্রবাসী ভাইয়ের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে দেখা করে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তিনি উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বান্দারাজার পাড়া এলাকায় নিহতদের এলাকায় যান। তিনি স্থানীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন এবং শোকবিহ্বল পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা ভাই এনামের সাথে কথা বলে তাদের প্রতি সমবেদনা জানান।

এ সময় এমপি হুমাম কাদের চৌধুরীর সাথে ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান, স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

পরিবারটির সাথে কথা বলার পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সাংসদ বলেন, এই পরিবারের সদস্যরা আপনাদেরই আপনজন। সমাজের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে এই চরম দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানো। মৃত্যু যে কোনো সময় আসতে পারে, এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল যে আমরা কেউ চিরস্থায়ী নই। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চারজনই চলে গেছেন, এখন একমাত্র বেঁচে থাকা এনামের দায়িত্ব নেওয়া আমাদের সবার কর্তব্য।সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি মরদেহের বিষয়ে আপডেট দিয়ে বলেন, ওমানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করা হচ্ছে। আশা করছি, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে মরদেহগুলো সরাসরি চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাবে।

সাংসদ জানান, নিহতদের বৃদ্ধা মা বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ। চার সন্তানের মৃত্যুর খবর তিনি সইতে পারবেন না বিধায় তাকে এখনো কিছুই জানানো হয়নি। মায়ের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে এবং তাকে বিচলিত না করতে তিনি বৃদ্ধার সাথে দেখা না করেই ফিরে যান। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষকে পরিবারের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার এবং তাদের কিছুটা ব্যক্তিগত সময় দেওয়ার অনুরোধ জানান।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় অসুস্থ বড় ভাই রাশেদুল ইসলামকে ডাক্তার দেখাতে ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বাকি তিন ভাই শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়ির ভেতর এসি চালিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়ির এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনো অক্সাইড গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করায় ঘুমন্ত অবস্থাতেই চার ভাইয়ের মৃত্যু হয়।

নিহত চার ভাই হলেন রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। তাদের বাবার নাম মৃত জামাল উদ্দিন। রাশেদুল ও শাহেদুল বিবাহিত ছিলেন এবং সিরাজুল ও শহিদুল ছিলেন অবিবাহিত। শুক্রবার যে দিনটিতে দুই ভাইয়ের বিদেশ থেকে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই বাড়িতে এখন চার ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় চলছে শোকের মাতম। আনন্দপুরী গ্রামটি এখন যেন এক নিস্তব্ধ পাথরের শহর।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমারা গেল আরো১ ২ শিশু, মৃত্যু ছাড়াল ৪৫০
পরবর্তী নিবন্ধলবণের উচ্চমূল্য, দুশ্চিন্তায় কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা