চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২১ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ। বন্দরের পাশাপাশি বেসরকারি আইসিডিগুলো থেকেও কোনো ধরনের পণ্য আনা-নেয়া করা হচ্ছে না। এতে করে দেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন মুখ থুবড়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
গতকাল শনিবার ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হয়েছে। প্রথম দিনের মতো গতকালও বন্দরে কোনো কন্টেনার আনা-নেওয়া করা যায়নি। জাহাজ থেকে কয়েক হাজার কন্টেনার বন্দরের ইয়ার্ডে নামানো হলেও একটি কন্টেনারও বাইরে পাঠানো যায়নি। এতে করে বন্দরে কন্টেনার জট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে বেসরকারি আইসিডি এবং বিভিন্ন কারখানা থেকে রপ্তানি পণ্য বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় কন্টেনার রেখে জাহাজ নোঙর তোলার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে রপ্তানিকারকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আজ রোববার ধর্মঘট প্রত্যাহারের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কারণে ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সংকটে পড়বে। এতে শুধু আমদানি ও রপ্তানিকারকেরাই নন, সাধারণ ভোক্তা শ্রেণীও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত বুধবার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ২৩ শতাংশ বৃদ্ধির পর শুক্রবার থেকে যানবাহন না চালানোর ঘোষণা দেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং কন্টেনার মুভারসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দেওয়ায় যাত্রীদের সংকটের পাশাপাশি দেশব্যাপী পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। এতে বন্দরে কোনো কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, কন্টেনার মুভার পণ্য নিয়ে প্রবেশ করেনি, বন্দর থেকেও পণ্য নিয়ে বের হয়নি। বন্দরে দৈনিক ৮ হাজারেরও বেশি গাড়ি পণ্য পরিবহন করে। এই বিপুল সংখ্যক গাড়ির একটিও গতকাল চলাচল করেনি। এতে করে বন্দর ইয়ার্ডে কন্টেনারের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক আজাদীকে বলেন, পরিবহন ধর্মঘটের ফলে কোনো পণ্য ডেলিভারি হচ্ছে না। আইসিডি থেকেও কোনো পণ্য বন্দরে আসছে না। এতে করে বন্দরের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থা লাগাতার হলে বন্দরে কন্টেনার জটসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, গতকাল প্রায় দেড় হাজার কন্টেনার ডেলিভারি হওয়ার প্রোগ্রাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গাড়ি না থাকায় এসব কন্টেনার ডেলিভারি হয়নি।
বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে মোট ৪৯ হাজার ১৮ টিইইউএস কন্টেনার রাখার জায়গা রয়েছে। গতকাল সেখানে ৩৬ হাজার টিইইউএস কন্টেনার ছিল। দু-চার দিন কন্টেনার ডেলিভারি বন্ধ থাকলে বন্দর কর্তৃপক্ষের ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হবে। বন্দরের জেটিতে গতকাল ১৬টি জাহাজ অবস্থান করছিল। এর মধ্যে ৯টি কন্টেনারবাহী, চারটি সারবাহী, দুটি সিমেন্ট ক্লিংকার এবং দুটি খাদ্যপণ্য বোঝাই। এছাড়া বহির্নোঙরে অবস্থানরত ৪৪টি মাদার ভ্যাসেলে কাজ চলছে।
অপরদিকে বন্দরে বিভিন্ন জাহাজ থেকে খালাস করা কন্টেনার বেসরকারি আইসিডিতে নিয়ে পণ্য খালাস করা হয়। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে বেসরকারি আইসিডিতে কন্টেনার স্থানান্তর পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বেসরকারি কন্টেনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সেক্রেটারি মোহাম্মদ রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ১৯টি ডিপো থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার কন্টেনার বন্দরে যাওয়া-আসা করে। এগুলো পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গতকাল অফডকগুলো থেকে একটি কন্টেনারবাহী গাড়িও বন্দরে যায়নি কিংবা বন্দর থেকে আসেনি। ১৯ আইসিডির ধারণক্ষমতা ৭৮ হাজার ৭০০ টিইইউএস। গতকাল আইসিডিগুলোতে ৫২ হাজারের মতো কন্টেনার ছিল। এমন পরিস্থিতে তিন-চার দিন হয়ত চালানো যাবে। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে সংকটের সুরাহা না হলে বন্দর এবং আইসিডিগুলোতে সংকট প্রকট হবে।
বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, করোনাকালে আমরা নানাভাবে সংকটে রয়েছি। এর মাঝে আমাদের পণ্য বোঝাই কন্টেনারগুলো বন্দরে পৌঁছতে পারছে না। আবার বন্দর থেকে কাঁচামাল বের হচ্ছে না। জেটিতে আমাদের পণ্যের জন্য জাহাজ অপেক্ষা করছে। কন্টেনার রেখে খালি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করবে। এতে ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা সংকটে পড়বেন।
দ্রুত সংকট সুরাহায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম বলেন, পণ্য পরিবহন বন্ধ মানে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ। বন্দরে খালি জাহাজ বসে থাকলে সেটার ডেমারেজ ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ছে। এটার প্রভাব স্বাভাবিকভাবে ভোক্তার ওপর পড়বে। এটা কোনোভাবেই ঠিক না। ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন একটি সংকট তৈরি হয়েছে যে, দেশের সর্বস্তরের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরিবহন ভাড়া বাড়লেও সহনীয় থাকবে : কাদের
পরবর্তী নিবন্ধবাধা ব্যারিকেডে বেড়েছে ভোগান্তি