গরমে চাহিদার তুঙ্গে তালপাতার হাতপাখা

জব্বারের মেলায় বিক্রি হওয়া হাতপাখা সিংহভাগই এসেছে চন্দনাইশের জিহস ফকিরপাড়া থেকে

মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ | শনিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

দেশব্যাপী চলছে তীব্র তাপদাহ। পাশাপাশি উপর্যুপরি বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে অতীষ্ঠ সাধারণ মানুষ। তীব্র তাপদাহে ঘরে বাইরে কোথাও এতটুকু স্বস্তি নেই। একটু শীতল পরশের আশায় মানুষ এখন হাত বাড়াচ্ছে তালপাতার হাতপাখার দিকে। ফলে চাহিদার তুঙ্গে উঠেছে তালপাতার হাতপাখা। আর এ ঐতিহ্যবাহী তালপাতার হাতপাখার সিংহভাগই তৈরী হয় চন্দনাইশ উপজেলায়। বর্তমানে তীব্র তাপদাহে প্রতিদিন অসংখ্য পাইকারি ব্যবসায়ী পাখা তৈরীর গ্রাম উপজেলার জিহস ফকিরপাড়া থেকে তালপাতার হাতপাখা সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। এদিকে গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া জব্বার মিয়ার বলীখেলা উপলক্ষে অনেক আগে থেকেই ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার হাতপাখা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন চট্টগ্রামের লালদীঘি এলাকায়। এখানে বিক্রি হওয়া সিংহভাগ তালপাতার হাতপাখা চন্দনাইশের জিহস ফকিরপাড়ার তৈরি।

এছাড়া পহেলা বৈশাখ থেকে বসা বিভিন্ন মেলায় যুগ যুগ ধরে বিশাল একটি স্থান দখল করে আছে তালপাতার হাতপাখা। মেলায় আসা দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে রং বেরংয়ের তালপাতার এই হাতপাখা। এই আধুনিক যুগে এসেও এ হাতপাখার কদর একটুও কমেনি। বরং এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। পাখা শিল্পীরা জানিয়েছেন, এখানকার প্রতিটি হাতপাখা প্রকারভেদে বর্তমানে দুইশ থেকে থেকে সাড়ে তিনশ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। হাতপাখা তৈরীর সাথে জড়িত পাখা শিল্পীদের দেয়া তথ্য মতে, প্রতিবছর শুধুমাত্র জব্বারের বলি খেলায় কমপক্ষে ৪ লাখ হাতপাখা বিক্রি হয়। টাকার হিসেবে যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি টাকা।

বর্তমানে চন্দনাইশের জিহস ফকিরপাড়া গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠানে হাতপাখা তৈরীর কাজে সকল বয়সের নারী, পুরুষ, যুবক, যুবতী এমনকি শিশু কিশোররা নেমে পড়েছেন। গ্রামের প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার হাতপাখা তৈরীর সাথে জড়িত রয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, আধ্যাত্মিক সাধক জিহস ফকিরের নামানুসারে এ গ্রামটিকে জিহস ফকিরপাড়া হিসাবে নামকরণ করা হলেও বর্তমানে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে পাখাগ্রাম হিসেবে। এ গ্রামের পাখা শিল্পী মো. নাসির উদ্দীন জানান, জব্বারের বলি খেলা উপলক্ষে ইতিমধ্যে তিনি ১ হাজার অধিক হাতপাখা পাইকারদের নিকট বিক্রি করেছেন। বর্তমান চলমান তীব্র তাপদাহে হাতপাখার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিনিই শত শত হাতপাখা তৈরী করতে হচ্ছে। তিনি জানান, সারাবছর এখানকার হাতপাখার কদর থাকে। তবে বৈশাখী মেলা বিশেষ করে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বার মিয়ার বলী খেলা উপলক্ষে আয়োজিত লালদীঘির মেলায় চন্দনাইশের হাতপাখার বিশাল বাজার বসে। এখানকার পাখা শিল্পীরা মূলত বৈশাখী মেলাকে টার্গেট করেই বানান বিভিন্ন ধরনের তালপাতার হাতপাখা। এ গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই একেকজন দক্ষ পাখা শিল্পী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শতাধিক বছর আগে চন্দনাইশের জিহস ফকির পাড়ার পূর্ব পুরুষরা এ হাতপাখা তৈরীর কলাকৌশল রপ্ত করেন। এরপর থেকে যুগ যুগ ধরে বংশানুক্রমে স্বগৌরবে চলছে হাতপাখা তৈরী। ৭ তারী, ৯ তারী, ১১ তারী, ১৩ তারী ও ১৫ তারীর হাতপাখা তৈরী করেন এখানকার পাখা শিল্পীরা। এরমধ্যে ৯ এবং ১১ তারী পাখার চাহিদা থাকে বেশী। চাহিদা সম্পন্ন হাতপাখাগুলো তালগাছের ডিগ পাতা দিয়ে তৈরী করা হয়। ফলে এটি মজবুত ও টেকসই হওয়ায় দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। ভবিষ্যতে এ শিল্পটির আরো ব্যাপকতার জন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারিভাবে আর্থিক ঋণ পেলে তাদের তৈরীকৃত হাতপাখা বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে রপ্তানী সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই কিছু কিছু হাতপাখা বিদেশে নিয়ে যান বলে জানান পাখাশিল্পীরা।

চন্দনাইশের জিহস ফকিরপাড়া গ্রাম থেকে তালপাতার হাতপাখা সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম নগরীতে নিয়ে যাওয়ার সময় পাইকারি হাতপাখা ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান (৬০) জানান, তিনি বিগত ৩০ বছর ধরে হাতপাখা ব্যবসার সাথে জড়িত। চলতি মৌসুমে তিনি কমপক্ষে ১০ হাজারের অধিক হাতপাখা নিয়ে গেছেন চট্টগ্রাম নগরীতে। বর্তমানে তীব্র তাপদাহে বহুগুণ বেড়েছে হাতপাখার চাহিদা। হাতপাখা গ্রাম ঘুরে প্রতিদিন যা পান তাই নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে পাইকারি হিসেবে বিক্রি করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতীব্র গরমে কাহিল মানুষ বেড়েছে দুর্ভোগ
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম-সিলেট রুটে ট্রেন যাত্রীদের দুর্ভোগ কাটছে না