খুন করে গত তিন দিনে ১৪ বার স্থান পরিবর্তন করেও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পারল না নগরীর চিহ্নিত সন্ত্রাসী মো. ফয়সাল ইসলাম বাবু ওরফে পিস্তল বাবু ও তার সহযোগী সুমন। তাদের স্থান পরিবর্তনের কাজটি তদারকি করেছেন বড়ভাই খ্যাত মো. রুবেল; যার আশকারায় চলে বাবুর সকল অপকর্ম। আর প্রত্যক্ষভাবে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছিলেন বাবুর পিতা মো. লোকমান। কোতোয়ালী থানা পুলিশের একটি বিশেষ টিম টানা ৪৮ ঘণ্টা তাদের ধাওয়া করে অবশেষে শনিবার রাতে আখাউড়ার ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে সফল হয়। ধরা পড়ার আগে পর্যন্ত তারা ভাবতেই পারেনি, কোনো ক্লু না রেখে এতদূর চলে আসার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তাদের ধরা পড়তে হবে। সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নোবেল চাকমা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে বাবু স্বীকার করেছে, তাদের পরিকল্পনা ছিল ভারতে পালিয়ে যাওয়া।
কোতোয়ালী থানার ওসি জাহিদুল কবির আজাদীকে বলেন, আমার টিমের সদস্যরা টানা ৪৮ ঘণ্টা নাওয়া খাওয়া ভুলে ঘটনায় জড়িত চার আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়েছে। একজন ওসি হিসেবে এমন চৌকষ কিছু অফিসার পেয়ে আমি গর্বিত। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আসামি সুমন। বাকি তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত একদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার বাদী নিহত মো. মইন উদ্দিনের ভাই মো. নেজাম উদ্দিন আজাদীকে জানান, ইয়াছমিন আক্তার টিনা নামের একজনের সঙ্গে নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে যৌথভাবে বাণিজ্য মেলায় একটি স্টল দিয়েছিলেন মইন উদ্দিন। ৭ জুন তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে বাবু হুমকি দিয়েছল। বলেছিল টাকা না পেলে তাদের ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকা থেকে মালামাল এনে মঈন উদ্দিন কাজীর দেউড়ি ২ নম্বর গলিতে টিনাদের বাসায় যাচ্ছিলেন। টিনার ভাই মোবারক এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন। বাবু ও তার দুই সহযোগী তখন তাদের পথ আটকে আবারও টাকা চান। টাকা দিতে না চাইলে মইন উদ্দিন ও মোবারকের সঙ্গে থাকা পোশাকের প্যাকেট ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। ধস্তাধস্তির মধ্যে মোবারকের বাঁ পায়ে ছুরিকাঘাত করে রাস্তায় ফেলে দেয় বাবু। মঈন উদ্দিন তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় তার দুই পায়ের উরুতে এবং বুকের বাঁ পাশে ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে তিনজন পালিয়ে যায়। আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মঈন উদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করেন। আর আহত মোবারককে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর বাবুকে ধরতে করা অভিযান টিমের অন্যতম সদস্য কোতোয়ালী থানার এসআই মোমিনুল হাসান আজাদীকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার ভোরে মইন উদ্দিন ও মোবারকের ওপর হামলার পর বাবু ও তার সহযোগীরা প্রথমে মোটরসাইকেলযোগে লোহাগাড়া, এরপর কঙবাজারে পালিয়ে গিয়েছিল। পুলিশ তাদের খোঁজে সেখানে অভিযানে গেলে সেখান থেকে মাইক্রোবাসে কুমিল্লা যায়। এরপর সিএনজি টেঙিতে করে বাবু দলবল নিয়ে পালিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যায়।
তিনি বলেন, পুলিশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে নবীনগর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। পরে কসবা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বাবু ও তার সহযোগী রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের পালাতে সহযোগিতার অভিযোগে বাবুর বাবা লোকমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রামে আনার পর তাদের দেওয়া তথ্যে আউটার স্টেডিয়ামের উত্তর পাশের গার্ডার ওয়াল সংলগ্ন ময়লার স্তূপ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও পুলিশ উদ্ধার করেছে। পালিয়ে যাওয়ার সময় পিস্তল বাবু একাধিকবার মোবাইল নম্বর, লোকেশন পরিবর্তন করছিল বলে জানান তিনি।
সিএমপির সহকারী কমিশনার মো. মুজাহিদুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, অভিযুক্ত পিস্তল বাবু চাঁদাবাজি ও ছিনতাই করে চলে। মূলত কাজির দেউড়ি, চকবাজার, পাঁচলাইশ এলাকায় তার প্রভাব রয়েছে। তিনি বলেন, পিস্তল বাবুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তদন্ত করা হচ্ছে।












